১১ জুলাইয়ের প্রতিরোধ: শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের জবাবে সহিংস দমন, রাজপথে উত্তাল দেশ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০২৫
  • ৫০ বার
১১ জুলাইয়ের প্রতিরোধ: শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের জবাবে সহিংস দমন, রাজপথে উত্তাল দেশ

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি অনন্য সংযোজন ঘটল ১১ জুলাই তারিখে, যেখানে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে পরিচালিত কোটা সংস্কার আন্দোলন ঢুকে পড়ল আরও এক নতুন পর্বে—এবার সহিংস প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এতদিন যেসব হুমকি বা চাপ ছিল ছায়ার আড়ালে, সেগুলো এদিন প্রকাশ্য হয়ে ওঠে পুলিশের গুলি, লাঠিচার্জ এবং ছাত্রলীগের সমন্বিত আক্রমণের মধ্য দিয়ে। আন্দোলনের চিত্র শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়ে কুমিল্লা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, বরিশালসহ সারাদেশে।

এই দিনে শিক্ষার্থীদের ওপর সরকারি বাহিনী ও শাসক দলের সহযোগী সংগঠনের আক্রমণ আন্দোলনের ইতিহাসে একটি মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনে প্রথমবারের মতো পুলিশ ও ছাত্রলীগ একসঙ্গে মাঠে নামে সরাসরি দমন অভিযানে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের হামলায় আহত হন অন্তত ২০ জন, যার মধ্যে একজন সাংবাদিকও রয়েছেন। একইভাবে ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম শহর, এবং অন্যান্য স্থানে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো হয় আক্রমণ।

অন্যদিকে, সরকারের অবস্থানও এদিন আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ একাধিক মন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলন, বক্তব্য এবং সংবাদ চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের হুঁশিয়ারি দেন। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ড. খ. মহিদ উদ্দিন সরাসরি জানান, “কোনো শিক্ষার্থী এই আন্দোলনে অংশ নিলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এই হামলা ও হুমকির প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের মাঝে জন্ম নেয় নতুন এক প্রতিরোধের স্পৃহা। রাত ৯টার দিকে শাহবাগে জরুরি সমন্বয় সভায় আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন, পরদিন ১২ জুলাই বিকেল ৪টায় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে বিক্ষোভ ও সমাবেশ হবে। তিনি বলেন, “জরুরি সংসদ অধিবেশন ডেকে কোটা বাতিলের আইন পাস না করা পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বো না।”

এই ঘটনার পরপরই রাতের বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা আবারও শাহবাগে জমায়েত হন। পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে তারা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে পর্যন্ত পৌঁছে যান, সেখান থেকে আবার ফিরে এসে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করেন শাহবাগ মোড়ে।

১১ জুলাইয়ের আন্দোলন কেবল ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো করে অবরোধ ও প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে নিয়েছে। ঢাকার সায়েন্স ল্যাব এলাকায় অবরোধ করেন ঢাকা কলেজ ও ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরা, ফার্মগেট-মিরপুর সড়কে বাধা উপেক্ষা করে রাস্তায় নামেন শেকৃবি শিক্ষার্থীরা—পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষও হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অবরোধ করেন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, পাবনায় সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েও দেখা দেয় গণআন্দোলনের বিস্তার।

তবে শুধু শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ নয়, এই দিনটি শাসক দলের বিভ্রান্তি ও অস্থিরতাও চোখে আনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ছাত্রলীগ নিজেদের মধ্যে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে—ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক হাস্যরসে রূপ নেয়। পরে মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন আন্দোলনটিকে ‘রাজনৈতিক’ বলে অভিহিত করেন, যা নিয়ে পরবর্তীতে নানা মহলে প্রশ্ন ও বিতর্ক দেখা দেয়।

১১ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দেয়—কোটা সংস্কার আন্দোলন এখন আর নিছক একটি নীতিগত দাবি নয়; এটি রূপ নিচ্ছে একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রতিরোধে, যেখানে প্রজন্মের দাবির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্রযন্ত্র ও শাসক রাজনৈতিক শক্তি। শিক্ষার্থীরা আজ বলছে—বৈষম্যহীন, ন্যায্য ও যৌক্তিক সমাজ চাই, আর সে দাবির বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের পরিণতি ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে একটি নতুন ভাষ্যে।

এই দিনটি তাই শুধু একটি তারিখ নয়, বরং একটি আন্দোলনের উত্তরণ, একটি সময়ের প্রতিবাদ এবং একটি প্রজন্মের প্রত্যয় হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত