প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজীপুরের শ্রীপুরে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে মাদক কারবারিদের সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিত হামলার মুখে পড়েছে পুলিশ। বুধবার রাতে শ্রীপুর পৌরসভার মাওনা পিয়ার আলী কলেজ এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালাতে গিয়ে চার পুলিশ সদস্য গুরুতরভাবে আহত হন। এ সময় পুলিশের ব্যবহৃত দুটি গাড়ি ও একটি সিএনজি অটোরিকশা ভাঙচুর করা হয় এবং আটক দুই আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই চরম অবনতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মাওনা এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচা করছে—এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শ্রীপুর থানা পুলিশের একটি দল সেখানে অভিযান চালায়। অভিযানে পুলিশ প্রথমে তিনজন মাদক কারবারিকে আটক করতে সক্ষম হয়। আটককৃতরা হলেন লাকী আক্তার, জাহাঙ্গীর হোসেন ও মো. রাজীব। তাদের কাছ থেকে ইয়াবা উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে আটকের খবর মুহূর্তের মধ্যেই এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। স্থানীয় মাদক কারবারি ও তাদের সহযোগীরা সংঘবদ্ধ হয়ে দেশীয় অস্ত্র, রামদা, লোহার রড ও ইট-পাটকেল নিয়ে পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা চারদিক থেকে পুলিশকে ঘিরে ফেলে এবং নির্বিচারে ইট ছুড়তে থাকে। এতে পুলিশ সদস্যরা আত্মরক্ষার সুযোগও খুব কম পান।
একপর্যায়ে হামলাকারীরা অভিযানে ব্যবহৃত পুলিশের দুটি পিকআপ ভ্যান ভাঙচুর করে। গাড়িগুলোর কাচ ভেঙে ফেলা হয় এবং আশপাশে থাকা একটি সিএনজি অটোরিকশাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে হামলাকারীরা পুলিশের হেফাজত থেকে জাহাঙ্গীর হোসেনসহ দুই আসামিকে ছিনিয়ে নেয়। পুরো ঘটনাটি ঘটে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই তুলে ধরে।
হামলায় শ্রীপুর থানার উপপরিদর্শক অরূপ কুমার বিশ্বাস ও উপপরিদর্শক মুহাম্মদ মাসুদ রানাসহ মোট চার পুলিশ সদস্য আহত হন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। খবর পেয়ে দ্রুত অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে আহত পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়, যেখানে তারা চিকিৎসাধীন ছিলেন।
এই ঘটনার পর এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রকাশ্যে পুলিশের ওপর এমন হামলার ঘটনা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই বলেন, মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়েছে যে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও ভয় পাচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষ আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
ঘটনার পর শ্রীপুর থানার উপপরিদর্শক অরূপ কুমার বিশ্বাস বাদী হয়ে শ্রীপুর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ২৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাত আরও ৮০ থেকে ৯০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার অভিযোগে সরকারি কাজে বাধা প্রদান, পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধের উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি উদ্ধার করা মাদক সংক্রান্ত পৃথক একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযানের সময় হামলাকারীরা ঘটনাস্থলে তিনটি মোটরসাইকেল ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। সেগুলো জব্দ করা হয়েছে এবং এসব আলামত তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাছির আহমেদ জানান, সরকারি কাজে বাধা ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং পলাতক আসামিদের ধরতে একাধিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। যারা পুলিশের ওপর হামলা করেছে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ঘটনা মাদক কারবারিদের সংগঠিত শক্তি ও আগ্রাসী মানসিকতার একটি ভয়ংকর দৃষ্টান্ত। তারা বলেন, মাদক ব্যবসা শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি সমাজের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলছে। পুলিশের ওপর এমন হামলা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল, যা কঠোরভাবে দমন করা হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের নিরাপত্তা ও প্রস্তুতি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। কারণ, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচেষ্টায় এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
এই ঘটনার পর গাজীপুরসহ আশপাশের এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, শ্রীপুরের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে যে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে লড়াই কতটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং চ্যালেঞ্জিং। তবে পুলিশের দৃঢ় অবস্থান ও চলমান অভিযানের মাধ্যমে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে—এমন প্রত্যাশাই করছেন স্থানীয়রা।