প্রকাশ: ০১ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শহীদ ওসমান হাদি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনব্যাপী ধর্মীয় ও স্মরণমূলক কর্মসূচি পালন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৪তম আবর্তনের শিক্ষার্থীরা। নতুন বছরের প্রথম দিনে এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তারা শ্রদ্ধা, স্মরণ এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার এক মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ‘মোনাজাতে ইনসাফ’ শিরোনামে আয়োজিত এ কর্মসূচি ছিল রোজা, কোরআন খতম, সালাতুল হাজত, কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল ও সম্মিলিত ইফতারের সমন্বয়ে একটি পরিপূর্ণ স্মরণানুষ্ঠান।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সকাল থেকে ঢাবি ক্যাম্পাসের টিএসসি এলাকায় এই কর্মসূচি শুরু হয়। অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা দিনভর রোজা পালন করেন। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন বছরের সূচনালগ্নে দেশ, জাতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ন্যায়বিচার, নৈতিকতা ও মানবিকতার দোয়া করতেই এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাদ যোহর সম্মিলিত কোরআন খতম অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষার্থীরা সারিবদ্ধভাবে অংশ নেন এবং কোরআনের আয়াত তেলাওয়াতের মাধ্যমে শহীদ ওসমান হাদি ও বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। আয়োজকরা জানান, কোরআন খতম ছিল এই কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে ধর্মীয় আবহের মধ্য দিয়ে স্মরণকে গভীরতর করা হয়েছে।
বিকেল তিনটায় নতুন বছরকে সামনে রেখে সালাতুল হাজত আদায় করা হয়। শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে দেশের শান্তি, ন্যায়বিচার এবং সকল প্রকার অন্যায় ও আধিপত্যবাদ থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থনা করেন। নামাজ শেষে শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে ছিল এক ধরনের আত্মিক প্রশান্তি, যা পুরো পরিবেশকে আরও আবেগঘন করে তোলে।
এরপর বাদ আসর শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করা হয়। সেখানে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনাও করা হয়। দোয়া মাহফিলটি ঢাবি টিএসসির সবুজ চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। সবুজ চত্বরে বসে শিক্ষার্থীরা নীরবতা, প্রার্থনা ও সম্মিলিত অনুভূতির মধ্য দিয়ে স্মরণকে অর্থবহ করে তোলেন।
দোয়া মাহফিলে বক্তব্য দেন ইনকিলাব মঞ্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক ফাতিমা তাসনিম জুমা। তিনি শহীদ ওসমান হাদির সংগ্রাম, দর্শন এবং স্বপ্ন নিয়ে গভীরভাবে কথা বলেন। জুমা বলেন, শহীদ ওসমান হাদির সংগ্রাম ছিল কেবল একটি সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের কাছে আধিপত্যবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক লড়াই পৌঁছে দেওয়া ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। তিনি কখনো কাউকে জোর করে ইনকিলাব মঞ্চে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানাননি, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন—এই লড়াই এগিয়ে নিতে শতাধিক সংগঠন ও অসংখ্য মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, জীবদ্দশায় হয়তো শহীদ ওসমান হাদি তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে দেখেননি, তবে তাঁর বিশ্বাস ছিল—একদিন এই সাংস্কৃতিক সংগ্রাম সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়বে। আজ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে যে চেতনার বিস্তার ঘটেছে, তা মূলত তাঁর সেই স্বপ্নেরই বাস্তব রূপ। তাঁর আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে ন্যায় ও ইনসাফের পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করছে।
ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, শহীদ ওসমান হাদির স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে তারা কাউকে জোর করে কোনো সংগঠনে যুক্ত হতে আহ্বান জানাবেন না। তবে নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই দেশের ওপর যে কোনো ধরনের আধিপত্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে। এই প্রস্তুতির অর্থ কেবল রাজপথে নামা নয়; বরং বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পড়াশোনার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই সংগ্রামে যুক্ত হতে পারে। কেউ গান গাইবেন, কেউ নাচ করবেন, কেউ ছবি আঁকবেন, কেউ লেখালেখির মাধ্যমে প্রতিবাদ গড়ে তুলবেন। কাজের ধরন ভিন্ন হলেও কাউকে জোর করা হবে না। তবে শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতিটি প্রকাশে যেন বাংলাদেশের কথা, মানুষের কণ্ঠ এবং দেশের নিজস্ব পরিচয় প্রতিফলিত হয়—এই দায়িত্ব সবাইকে নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শিল্প-সাহিত্যের নামে যদি অন্য দেশের তাবেদারি করা হয় কিংবা সংস্কৃতির নামে ইসলামফোবিয়া বা বাংলাদেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতির বিকৃত ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়, তবে তার বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সিনেমা বন্ধ করে নয়, বরং তার বিপরীতে মানসম্মত সিনেমা নির্মাণের মাধ্যমেই বাংলাদেশের সত্তা ও দেশপন্থাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে হবে।
দোয়া মাহফিল শেষে মাগরিবের আগে রোজাদার শিক্ষার্থীরা সম্মিলিত ইফতারে অংশ নেন। টিএসসির সবুজ চত্বরে সারিবদ্ধভাবে বসে শিক্ষার্থীরা ইফতার করেন, যা এক অনন্য ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার চিত্র তুলে ধরে। অনেক শিক্ষার্থী বলেন, এমন কর্মসূচি শুধু স্মরণ নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও ভবিষ্যতের জন্য দায়বদ্ধ হওয়ার একটি উপলক্ষ।
সার্বিকভাবে, ওসমান হাদি ও বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে ঢাবি শিক্ষার্থীদের এই দিনব্যাপী আয়োজন নতুন বছরের প্রথম দিনেই একটি মানবিক ও নৈতিক বার্তা বহন করেছে। ধর্মীয় অনুভূতি, সাংস্কৃতিক সচেতনতা এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার সম্মিলনে এই কর্মসূচি ক্যাম্পাসজুড়ে গভীর প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।