জুলাই অভ্যুত্থানে বেওয়ারিশ দাফন ৮ শহীদের পরিচয় শনাক্ত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৫ বার
জুলাই অভ্যুত্থানে বেওয়ারিশ দাফন ৮ শহীদের পরিচয় শনাক্ত

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়ার পর যাদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি এবং যাদের বেওয়ারিশ হিসেবে রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়েছিল, সেইসব শহীদদের পরিচয় শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে সরকার। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে ইতোমধ্যে আটজন শহীদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ পরিবারগুলোর জন্য স্বস্তি ও আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি করেছে। এই অগ্রগতি শুধু প্রশাসনিক সাফল্যই নয়, বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শহীদদের প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এই তথ্য জানান। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ও পরবর্তী সময়ে যাদের লাশ পরিচয়বিহীন অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, তাদের অনেককে রায়েরবাজার কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এসব শহীদের পরিচয় শনাক্তকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় কবরস্থান থেকে উত্তোলন করা ১১৮টি লাশের মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে আটজনের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

প্রেস সচিব আরও জানান, যেসব শহীদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে, তাদের পরিবারের সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সম্মান প্রদর্শনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এই বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় শিগগিরই বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। সরকার চায়, প্রতিটি শহীদের নাম, পরিচয় ও আত্মত্যাগ ইতিহাসে সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হোক।

শফিকুল আলম বলেন, শহীদদের পরিচয় শনাক্ত করা একটি অত্যন্ত জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং সংবেদনশীল কাজ। এখানে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতাই নয়, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখাও জরুরি। সে কারণেই এই পুরো প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি জানান, বসনিয়া যুদ্ধের সময় সেব্রেনিৎসা গণহত্যার পর যেভাবে হাজার হাজার লাশের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়েছে।

প্রেস সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, সেব্রেনিৎসায় ১০ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যার পর যেসব আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল ডিএনএ বিশ্লেষণ ও লাশ শনাক্তকরণে কাজ করেছিল, তারাই বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এর ফলে বাংলাদেশেও অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নির্ভুল পদ্ধতিতে ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে। দেশীয় কয়েকজন বিশেষজ্ঞকে আন্তর্জাতিক মানে দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে এই কাজকে টেকসই করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “সেব্রেনিৎসার ঘটনার পর যেভাবে প্রতিটি লাশের পরিচয় নিশ্চিত করতে ধাপে ধাপে কাজ করা হয়েছিল, বাংলাদেশেও একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এটি দ্রুত শেষ করার মতো কোনো কাজ নয়। প্রতিটি শহীদের পরিচয় নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সময় লাগলেও আমরা এই প্রক্রিয়া থেকে সরে আসব না।”

উল্লেখ্য, জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানে দেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত মানুষ শহীদ হন। অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা, গুলিবর্ষণ ও দমন-পীড়নের মধ্যে আহত বা নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। হাসপাতাল, সড়ক কিংবা অন্যান্য স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া বহু লাশের কোনো পরিচয় না পাওয়ায় সেগুলো বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করতে বাধ্য হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। রায়েরবাজার কবরস্থান ছিল এমন একটি স্থান, যেখানে এসব অজ্ঞাত পরিচয়ের লাশ সমাহিত করা হয়।

এই পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই শহীদ পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভ ও বেদনা প্রকাশ করে আসছিলেন। অনেক পরিবার তাদের প্রিয়জনের কোনো খোঁজ না পেয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষায় ছিলেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় এবং শহীদদের পরিচয় শনাক্তের উদ্যোগ নেয়। কবরস্থান থেকে লাশ উত্তোলন, ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য স্বজনদের কাছ থেকে রেফারেন্স স্যাম্পল নেওয়ার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় মাটির নিচে থাকা লাশ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। আবহাওয়া, মাটির গুণাগুণ এবং সময়ের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপরও আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতার মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে সফলভাবে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। আটজন শহীদের পরিচয় শনাক্ত হওয়া সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও একটি বড় সাফল্য।

এই সাফল্যের মানবিক দিকও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিচয় শনাক্ত হওয়া মানে শুধু একটি নাম জানা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি পরিবার, একটি ইতিহাস, একটি জীবনের গল্প। অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন—তাদের সন্তান, স্বামী বা ভাই আদৌ বেঁচে আছেন নাকি শহীদ হয়েছেন, সেই প্রশ্নের উত্তর তারা পাননি। এখন অন্তত নিশ্চিতভাবে জানার সুযোগ পাচ্ছেন, যা তাদের শোকের মধ্যেও কিছুটা মানসিক শান্তি এনে দেবে।

সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, আটজনের পরিচয় শনাক্ত হলেও বাকি লাশগুলোর ক্ষেত্রেও প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ধাপে ধাপে আরও পরিচয় শনাক্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য স্বজনদের ডিএনএ নমুনা প্রদান এবং তথ্য যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগ শুধু বর্তমান সময়ের জন্য নয়, ভবিষ্যতের জন্যও একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। রাষ্ট্র যদি তার শহীদদের পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষায় আন্তরিক হয়, তবে তা জাতির সামষ্টিক স্মৃতি ও ইতিহাসকে আরও শক্তিশালী করে।

সব মিলিয়ে, জুলাই অভ্যুত্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা শহীদদের পরিচয় শনাক্তে এই অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য একটি মানবিক ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এটি প্রমাণ করে, সময় পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্র তার দায়িত্ব ভুলে যায়নি। প্রতিটি শহীদের নাম ও পরিচয় ফিরে পাওয়ার এই প্রয়াস অব্যাহত থাকবে—এমন প্রত্যাশাই এখন দেশবাসীর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত