হাদি হত্যার বিচার দাবিতে বরিশালে উত্তাল ছাত্র-জনতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৭ বার
হাদি হত্যার বিচার দাবিতে বরিশালে উত্তাল ছাত্র-জনতা

প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে বরিশাল নগরীতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজপথ। সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ পালন করেন আন্দোলনকারীরা। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই কর্মসূচিতে নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছাড়াও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সংহতি প্রকাশ করেন।

সোমবার সকাল ১১টার দিকে বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বের হওয়া এই মিছিল অল্প সময়ের মধ্যেই নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। মিছিলটি সদর রোডে পৌঁছালে সেখানে অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই অবস্থান কর্মসূচির ফলে সদর রোডসহ আশপাশের এলাকায় যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এতে সাময়িক ভোগান্তিতে পড়েন পথচারী ও যানবাহন চালকেরা, তবে অনেকেই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন।

বিক্ষোভ চলাকালে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তারা বলেন, শহীদ শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন জুলাই আন্দোলনের একজন সাহসী মুখপাত্র। তার হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন ও প্রতিবাদী কণ্ঠরোধের একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। বক্তারা অভিযোগ করেন, হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো প্রকৃত খুনিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই ব্যর্থতা জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করেছে।

বক্তারা আরও বলেন, একটি রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে সেখানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলা অর্থহীন হয়ে পড়ে। হাদি হত্যার বিচার না হওয়া মানে ভবিষ্যতে আরও অনেক হাদির জন্ম হবে এবং তারা একই পরিণতির শিকার হবে। তারা প্রশ্ন তোলেন, একজন পরিচিত আন্দোলনকর্মী ও মুখপাত্রকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হলেও যদি বিচার না হয়, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?

আন্দোলনকারীরা সরকারকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, অবিলম্বে হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় এই আন্দোলন শুধু বরিশালে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দেশব্যাপী আরও বিস্তৃত ও কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে তা চালিয়ে যাওয়া হবে। তারা জানান, এই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নয়, বরং ন্যায়বিচারের দাবিতে সাধারণ ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ।

এর আগে সকাল থেকেই বরিশাল নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা দলে দলে সদর রোড এলাকায় এসে জড়ো হতে থাকেন। তাদের হাতে ছিল বিভিন্ন প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার, যেখানে হাদি হত্যার বিচার, খুনিদের গ্রেপ্তার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধের দাবি উঠে আসে। পরে একটি বড় মিছিল নগরীর বটতলা ও চৌমাথা হয়ে নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছে। সেখানে প্রায় আধা ঘণ্টাব্যাপী সড়ক অবরোধ করা হয়। এ সময় নথুল্লাবাদ এলাকার যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

সমাবেশে বক্তারা হাদিকে একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, যেমন মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তেমনি জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা ওসমান হাদির বিচার না হলে আন্দোলনকারীদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তারা বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে রাষ্ট্র তার সাহসী সন্তানদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, সে রাষ্ট্র একসময় নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

বক্তারা দাবি করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালেই হাদি হত্যার বিচার সম্পন্ন করতে হবে। বিচার দীর্ঘসূত্রতায় পড়লে জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে বলে তারা সতর্ক করেন। আন্দোলনকারীরা স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেন, হাদি হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত এই ধরনের কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকবে। প্রয়োজনে আরও বড় পরিসরে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও সংহতি প্রকাশ করেন। অনেক সাধারণ মানুষ বলেন, তারা সরাসরি কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত না হলেও ন্যায়বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন। তাদের মতে, হাদি হত্যার বিচার শুধু একটি ব্যক্তির জন্য নয়, বরং এটি পুরো সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থীদের আচরণ ছিল শৃঙ্খলাপূর্ণ। কোথাও বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও আশপাশে সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তৎপর থাকলেও আন্দোলনকারীদের কর্মসূচিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেননি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বরিশালের এই বিক্ষোভ হাদি হত্যার বিচার দাবিতে চলমান আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রাজধানীর বাইরে আঞ্চলিক শহরগুলোতে শিক্ষার্থীদের এমন সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে ক্ষোভ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা মনে করেন, সরকার যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই আন্দোলন আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাজে সহিংসতা বাড়িয়ে দেয়। একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা শুধু নিহতের পরিবারের জন্য স্বস্তি নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ অপরাধ প্রতিরোধেও বড় ভূমিকা রাখে। তারা হাদি হত্যার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে, বরিশালে হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ ছাত্র-জনতার এই বিক্ষোভ কর্মসূচি আবারও প্রমাণ করেছে—ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তরুণ সমাজ এখনো আপসহীন। রাজপথে তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত দাবি স্পষ্ট—হাদি হত্যার বিচার চাই, এখনই চাই। এই দাবির বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না বলেই জানিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত