প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এমন এক নাম, যা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং গণতন্ত্র, অধিকার ও সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে বহু মানুষের অন্তরে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে—এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের বিএনপি প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া আজ শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার মৃত্যু পরবর্তী সময়েও তিনি এ দেশের মানুষের মননে, এমনকি সারা বিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষের হৃদয়ে জীবিত রয়েছেন।
সোমবার বিকাল চারটায় কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার রামপুর মিছবাহুল উলুম মাদ্রাসায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় আয়োজিত খতমে কোরআন ও দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ এসব কথা বলেন। ধর্মীয় আবহে আয়োজিত এই মাহফিলটি স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে অংশ নেন বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী, আলেম-ওলামা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বেগম খালেদা জিয়া তার জীবদ্দশায় যে সংগ্রাম করে গেছেন, তা শুধু ক্ষমতার জন্য নয়, বরং মানুষের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি বলেন, “এ দেশের শত সহস্র নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের দোয়া তিনি পেয়েছেন। তার জানাজায় মানুষের যে ঢল নেমেছিল, তা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসেও বিরল।” তার ভাষায়, এ পর্যন্ত বিশ্বের সর্ববৃহৎ জানাজাগুলোর একটি অনুষ্ঠিত হয়েছে বেগম খালেদা জিয়াকে ঘিরে, যা তার জনপ্রিয়তা ও মানুষের ভালোবাসার গভীরতাই প্রমাণ করে।
সালাহউদ্দিন আহমদ তার বক্তব্যে বেগম জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে বেগম জিয়াকে ব্যক্তিগত জীবনে চরম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। এই সংগ্রামের পথে তিনি তার স্বামী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হারিয়েছেন, সন্তান হারিয়েছেন এবং বারবার রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তবুও তিনি আপস করেননি। বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষের অধিকারের প্রশ্নে অটল থেকেছেন।
তিনি আরও বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। ক্ষমতায় থাকাকালীন যেমন তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন, তেমনি ক্ষমতার বাইরে থেকেও তিনি রাজপথে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার এই দ্বৈত ভূমিকা—রাষ্ট্রনায়ক ও আন্দোলনকারী—বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাকে একটি অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছে। সালাহউদ্দিন আহমদের মতে, এই কারণেই বেগম খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির নেত্রী হিসেবে নয়, বরং একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবে মানুষের মনে গেঁথে আছেন।
দোয়া মাহফিলে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে হারানোর শোক শুধু ব্যক্তিগত বা দলীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। তিনি বলেন, “এই শোক আমাদের কাঁদার জন্য নয়, এই শোক আমাদের জাগার জন্য। এটি শুধু একটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নয়, বরং সব সময়ের জন্য আমাদের প্রেরণা হয়ে থাকবে।” তার মতে, বেগম জিয়ার আদর্শ ও সংগ্রামকে ধারণ করেই একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথ খুঁজে নিতে হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় মানুষের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও ত্যাগ নতুন প্রজন্মের জন্য একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। তিনি বলেন, গণতন্ত্র কখনো সহজে আসে না; এর জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম, ধৈর্য ও ত্যাগ প্রয়োজন। বেগম জিয়ার জীবন সেই সত্যটিই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রামপুর মিছবাহুল উলুম মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক মৌলানা আবুল কাসেম। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, রাজনীতি ও ধর্ম আলাদা হলেও মানুষের কল্যাণের প্রশ্নে উভয়ের লক্ষ্য অভিন্ন। তিনি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং দেশ ও জাতির জন্য দোয়া করেন। তিনি বলেন, একজন মানুষের জীবনের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তার মৃত্যুর পর মানুষের ভালোবাসা ও স্মরণে থাকার মধ্য দিয়ে, আর সেই মানদণ্ডে বেগম খালেদা জিয়া নিঃসন্দেহে সফল।
খতমে কোরআন ও দোয়া মাহফিলে আরও উপস্থিত ছিলেন মাতামুহুরী সাংগঠনিক উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামিল ইব্রাহীম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক হেফাজতুর রহমান টিপু, সাংগঠনিক সম্পাদক শোয়াইবুল ইসলাম সবুজসহ বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা। তারা সবাই বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন, ত্যাগ ও সংগ্রামের কথা স্মরণ করেন এবং তার আদর্শ অনুসরণ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠান ঘিরে স্থানীয় এলাকাজুড়ে এক ধরনের আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনেকেই বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মতভেদ থাকলেও তার ব্যক্তিগত ত্যাগ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দোয়া মাহফিলে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষও বলেন, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং একজন সংগ্রামী নারী হিসেবেই তারা তাকে স্মরণ করবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সালাহউদ্দিন আহমদের এই বক্তব্য শুধু স্মরণসভামূলক নয়, বরং এটি আগামী দিনের রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। বেগম খালেদা জিয়ার নাম ও আদর্শকে সামনে রেখে বিএনপি যে রাজনৈতিক শক্তি ও আবেগকে সংগঠিত করতে চায়, তারই একটি প্রতিফলন দেখা গেছে এই দোয়া মাহফিলে। একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট যে, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখনও বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখছে।
সব মিলিয়ে, রামপুর মিছবাহুল উলুম মাদ্রাসায় আয়োজিত এই খতমে কোরআন ও দোয়া মাহফিল বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতিকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। তার জীবন, ত্যাগ ও সংগ্রামের গল্প আবারও আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের আলোচনায় ফিরে এসেছে সেই প্রশ্ন—একজন নেতার প্রকৃত শক্তি কোথায় নিহিত? অনেকের মতে, ক্ষমতায় নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার মধ্যেই একজন নেতার প্রকৃত সাফল্য, আর সেই জায়গাতেই বেগম খালেদা জিয়া আজও অম্লান।