কুয়াশা ও ন্যায্যমূল্য সংকটে বাঁশখালীর লবণচাষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৯০ বার
বাঁশখালী লবণ চাষের সংকট

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপকূলীয় জনপদ বাঁশখালী। লবণ উৎপাদনের জন্য দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই এলাকা শীত এলেই কর্মচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে। সাগরের লবণাক্ত পানি আর সূর্যের তাপে সাদা সোনার মতো ঝকঝকে লবণ উৎপাদনই এখানকার হাজারো পরিবারের প্রধান জীবিকা। তবে চলতি মৌসুমে ঘন কুয়াশা, বৈরী আবহাওয়া এবং উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার আশঙ্কা একসঙ্গে ভর করেছে চাষিদের জীবনে। ফলে বছরের শুরুতেই হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন বাঁশখালী ও আশপাশের এলাকার প্রায় ৩৮ হাজার লবণচাষি।

বাঁশখালী ছাড়াও আনোয়ারা, পেকুয়া ও রাজাখালীর বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে প্রায় ৬৯ হাজার একর জমিতে ইতোমধ্যে লবণ উৎপাদন শুরু হয়েছে। পুঁইছড়ি, ছনুয়া, শেখেরখীল, গন্ডামারা, চাম্বল, শীলকূপ, সরল, কাথরিয়া ও খানখানাবাদ—এসব ইউনিয়ন বহু বছর ধরেই লবণ উৎপাদনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। শীত মৌসুম শুরু হতেই মাঠ প্রস্তুত করে আধুনিক পলিথিন পদ্ধতিতে লবণ চাষে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার কৃষক। দেশের মোট লবণের চাহিদার একটি বড় অংশ এই অঞ্চল থেকেই পূরণ হয়, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরে শতভাগ জমিতেই আধুনিক পলিথিন পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদন শুরু হয়েছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন প্রায় আড়াই গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিসিকের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তায় চাষিরা আগের চেয়ে উন্নত কৌশলে লবণ উৎপাদনে সক্ষম হচ্ছেন। অনেক চাষি আগাম সময়ে মাঠ প্রস্তুত করে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি জমিতে এনে সূর্যের তাপে শুকিয়ে দ্রুত উৎপাদন শুরু করেছেন। এতে করে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি লবণ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে উৎপাদন বাড়লেও সমস্যার শেষ নেই। শীতের ঘন কুয়াশা লবণচাষে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের বেলায় সূর্যের তাপে যে লবণ তৈরি হচ্ছে, রাতের কুয়াশা ও আর্দ্রতার কারণে তা আবার পানিতে গলে যাচ্ছে। এতে চাষিদের শ্রম ও খরচ দুটোই বাড়ছে। ছনুয়া গ্রামের লবণচাষি আবদু ছোবহান বলেন, তিনি বর্গা নিয়ে দুই একর জমিতে লবণ চাষ করেন। কিন্তু ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা করছেন। অন্যদিকে মাহমুদুল ইসলাম নামের আরেক চাষি জানান, উৎপাদন হোক বা না হোক জমির মালিককে নির্দিষ্ট খাজনা দিতেই হয়। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাজারমূল্য কমে গেলে তার পুরো দায় চাষিকেই বহন করতে হয়।

বাঁশখালীর লবণের বিশেষত্ব হলো এর স্বাদ ও উজ্জ্বলতা। এখানকার লবণ অন্যান্য এলাকার তুলনায় বেশি মানসম্পন্ন বলে বাজারে এর চাহিদাও রয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি লবণের দাম ১ থেকে ১৫ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। পাইকারি বাজারে প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। চাষিদের অভিযোগ, এই দামে উৎপাদন খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। আধুনিক পলিথিন পদ্ধতিতে লবণ চাষ করতে পলিথিন, শ্রম ও অন্যান্য উপকরণের খরচ অনেক বেশি। ফলে অনেক চাষি মহাজন বা মিল মালিকদের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

ঋণের এই ফাঁদই চাষিদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি সহায়তার অভাবে মিল মালিক ও মহাজনরা কম দামে চাষিদের কাছ থেকে লবণ কিনে পরে তা বেশি দামে বাজারজাত করছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হলেও প্রকৃত উৎপাদকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক চাষি আগাম টাকা নিয়ে বাধ্য হয়ে কম দামে লবণ বিক্রি করতে সম্মত হচ্ছেন, কারণ ঋণ শোধের তাগিদ তাদের সামনে অন্য কোনো পথ রাখছে না।

বিসিকের বাঁশখালী উপজেলার কর্মকর্তা আনসারুল করিম জানান, চলতি মৌসুমে বাঁশখালী ও কক্সবাজার অঞ্চলে চাহিদার চেয়ে প্রায় দুই লাখ টন বেশি লবণ উৎপাদন হতে পারে। তাঁর মতে, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এই অতিরিক্ত উৎপাদন দেশীয় লবণশিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তিনি বলেন, বাঁশখালীর লবণের গুণগত মান উন্নত হওয়ায় এর বাজার সম্ভাবনা অনেক বেশি, কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে চাষিরা সেই সুফল পাচ্ছেন না।

ছনুয়া ও গন্ডামারা এলাকার মাঠ পরিদর্শনে গিয়ে স্থানীয় জমিদার বোরহান উদ্দিন চৌধুরী মিজান ও ব্যবসায়ী আলী আজগর সরকারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা দেশীয় লবণশিল্প রক্ষায় লবণ আমদানি বন্ধ করা এবং চাষিদের জন্য ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, বিদেশি লবণ আমদানি অব্যাহত থাকলে স্থানীয় বাজারে দাম আরও কমে যাবে, যা চাষিদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হবে।

লবণচাষ শুধু একটি অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়, এটি বাঁশখালীর মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও টিকে থাকার সংগ্রামের অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অঞ্চলের মানুষ লবণ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে ন্যায্যমূল্যের অভাব যদি একসঙ্গে চলতে থাকে, তাহলে এই শিল্প টিকে থাকাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। চাষিদের আশা, সরকার দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে—ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, সহজ ঋণ সুবিধা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। তবেই কুয়াশা আর অনিশ্চয়তার ভেতর থেকেও বাঁশখালীর লবণ আবার দেশের অর্থনীতিতে উজ্জ্বল অবদান রাখতে পারবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত