ঝিনাইদহের চার আসনে ভোটের উত্তাপ, বিএনপি-জামায়াতের দাপুটে লড়াই

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬২ বার
ঝিনাইদহের চার আসনে ভোটের উত্তাপ, বিএনপি-জামায়াতের দাপুটে লড়াই

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই ঝিনাইদহ জেলার চারটি সংসদীয় আসনে ভোটের মাঠে জমে উঠেছে রাজনৈতিক লড়াই। শহর থেকে গ্রাম, হাটবাজার থেকে চায়ের দোকান—সবখানেই এখন একটাই আলোচনা, কে হচ্ছেন পরবর্তী সংসদ সদস্য। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন-সংগ্রামের পর একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও বাড়ছে আগ্রহ ও কৌতূহল। এই আবহে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর জোর প্রচারে সরগরম হয়ে উঠেছে ঝিনাইদহের চার আসনের রাজনৈতিক ময়দান।

জেলার ছয়টি উপজেলা নিয়ে গঠিত ঝিনাইদহ-১ থেকে ঝিনাইদহ-৪—প্রতিটি আসনেই রাজনৈতিক সমীকরণ আলাদা, তবে সবখানেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি ও জামায়াতকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় থাকা এসব দলের নেতাকর্মীরা এবার নির্বাচনী প্রচারে নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়া, ছোট-বড় পথসভা, মতবিনিময় সভা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণায় দিন-রাত ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রার্থীরা।

ঝিনাইদহ-১ আসনটি শৈলকূপা উপজেলাকে ঘিরে গঠিত। এখানে বিএনপির মনোনয়ন ঘিরে শুরুতে ছিল নানা জল্পনা-কল্পনা। একাধিক প্রভাবশালী নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেও শেষ পর্যন্ত সাবেক কেন্দ্রীয় মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান দলীয় টিকিট নিশ্চিত করেন। মনোনয়ন ঘোষণার পর প্রতিদ্বন্দ্বী এক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি মনোনয়নপত্র জমা দেননি। ফলে আপাতত বিএনপি এই আসনে ঐক্যবদ্ধ বলেই মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। দলীয় বিভক্তি কাটিয়ে ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা চলছে।

এই আসনে জামায়াতে ইসলামী আগেভাগেই প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠ গোছানোর সুযোগ পেয়েছে। উপজেলা আমির এএসএম মতিউর রহমান দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রচার চালিয়ে নিজেকে পরিচিত মুখে পরিণত করেছেন। স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, ধর্মীয় ও সামাজিক ইস্যুতে সক্রিয়তা তাকে একজন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। ফলে ঝিনাইদহ-১ আসনে বিএনপি-জামায়াতের লড়াই বেশ হাড্ডাহাড্ডি হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ঝিনাইদহ-২ আসনটি হরিণাকুণ্ডু ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত, যা ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। শুরুতে আসনটি শরিকদের ছেড়ে দেওয়ার গুঞ্জন থাকলেও শেষ পর্যন্ত জেলা বিএনপির সভাপতি এমএ মজিদকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। এতে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। একসময় নির্যাতন ও দমন-পীড়নের শিকার নেতাকর্মীরা এবার ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাইছেন, তুলে ধরছেন অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামের কথা এবং ভবিষ্যতের উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এই আসনে জেলা আমির আলী আজম আবু বকরকে প্রার্থী করেছে। তিনি ইতোমধ্যেই একজন শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হিসেবে ভোটারদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন। নিয়মিত গণসংযোগ ও সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি বিএনপির শক্ত ঘাঁটিতে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। ফলে এই আসনেও ভোটের ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

ঝিনাইদহ-৩ আসনটি মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর নিয়ে গঠিত এবং দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখানে দলটির বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে, যা যেকোনো নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখে। জামায়াত এই আসনে কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য ও সাবেক নায়েবে আমির অধ্যাপক মাওলানা মতিয়ার রহমানকে প্রার্থী করেছে। প্রায় এক বছর ধরে তিনি এলাকায় সক্রিয় থেকে ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। তার অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা এই আসনে তাকে এগিয়ে রাখছে বলে মনে করছেন অনেকে।

বিএনপি এখানে তরুণ নেতা মেহেদী হাসান রনিকে প্রার্থী করেছে, যিনি প্রয়াত চারবারের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম মাস্টারের সন্তান। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয় দিয়ে তিনি ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন। তবে জামায়াতের শক্ত অবস্থানের কারণে এই আসনে বিএনপির পথ মোটেও সহজ নয়।

ঝিনাইদহ-৪ আসনটি কালীগঞ্জ ও সদরের একাংশ নিয়ে গঠিত এবং এখানেই সবচেয়ে জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বিএনপি এই আসনটি সদ্য দলে যোগ দেওয়া রাশেদ খানকে ছেড়ে দিলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ এতে ক্ষুব্ধ। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিএনপির ভেতরে প্রকাশ্য বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে এবং কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা সাইফুল ইসলাম ফিরোজ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। ফলে বিএনপির ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এই সুযোগকে কাজে লাগাতে জামায়াত এখানে নায়েবে আমির মাওলানা আবু তালিবকে প্রার্থী করেছে। দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয় থাকা এই নেতা বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে নিজেদের পক্ষে নেওয়ার কৌশল নিচ্ছেন। দলটির নেতাকর্মীরা মনে করছেন, ঐক্যবদ্ধ প্রচার ও সংগঠনের শক্তি দিয়ে তারা এই আসনে চমক দেখাতে পারেন।

সব মিলিয়ে ঝিনাইদহের চার আসনে ভোটের রাজনীতি এখন তুঙ্গে। দীর্ঘদিন পর একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে নতুন আগ্রহ। কে জিতবে, কে হারবে—সে প্রশ্নের উত্তর দেবে ভোটের দিন। তবে এটুকু নিশ্চিত, ঝিনাইদহে এবারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে রাজনৈতিক উত্তাপ ও কৌতূহলে ভরপুর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত