প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের রেশ আবারও এসে পড়েছে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায়। কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তবর্তী নাফ নদীতে মাছ ধরার সময় মিয়ানমার দিক থেকে ছোড়া গুলিতে মো. আলমগীর (৩০) নামে এক বাংলাদেশি জেলে আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাতে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং অংশে এ ঘটনা ঘটে, যা নতুন করে সীমান্ত নিরাপত্তা ও জেলেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আহত মো. আলমগীর হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বালুখালী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মৃত ছৈয়দ বলির ছেলে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে প্রথমে উখিয়ার কুতুপালং এমএমএস হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর নাফ নদীর হোয়াইক্যং এলাকার বিলাইচ্ছর দ্বীপ সংলগ্ন অংশে মাছ ধরছিলেন আলমগীর। তার সঙ্গে একই নৌকায় ছিলেন আরেক জেলে মো. আকবর। তারা নৌকা থামিয়ে নদীতে জাল ফেলছিলেন। ঠিক সেই সময় হঠাৎ মিয়ানমার দিক থেকে কয়েক রাউন্ড গুলির বিকট শব্দ ভেসে আসে। মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
আলমগীরের বড় ভাই সরওয়ার আলম জানান, গুলির শব্দ শোনার পরপরই নৌকার ভেতরে লুটিয়ে পড়েন আলমগীর। প্রথমে তারা বুঝতে পারেননি কী হয়েছে। পরে দেখা যায়, তার বাম হাত থেকে প্রচুর রক্ত ঝরছে। একটি গুলি তার বাম হাত ভেদ করে বেরিয়ে গেছে। সঙ্গে থাকা অন্য জেলেদের সহায়তায় দ্রুত তাকে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসা হয়।
এ ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নাফ নদীর এ অংশটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘর্ষ তীব্র হলে প্রায়ই সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। কখনো কখনো বিস্ফোরণের শব্দও ভেসে আসে, যা স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন সীমান্ত এলাকায় মাঝেমধ্যে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বৃহস্পতিবার রাতেও কয়েক রাউন্ড গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে একজন জেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
তিনি আরও বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ এমনিতেই আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। জেলেরা জীবিকার তাগিদে নদীতে নামলেও প্রতিনিয়ত জীবন ঝুঁকিতে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
বিজিবি উখিয়া ৬৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম জানান, নাফ নদীতে এক জেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর তারা পেয়েছেন। ঘটনার পরপরই সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সার্বিকভাবে স্বাভাবিক আছে বলে তিনি দাবি করেন।
তবে তিনি স্বীকার করেন, নাফ নদীতে জেলেদের মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কিছু জেলে সেখানে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে জেলেদের আরও সচেতন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার কথাও জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, নাফ নদী বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি জলসীমান্ত নয়, এটি হাজারো জেলের জীবিকার অন্যতম উৎস। কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে এই নদী এখন আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠছে। সীমান্তের ওপারে সংঘর্ষ বাড়লেই এর প্রভাব পড়ছে এপারে। গোলাগুলি, বিস্ফোরণের শব্দ এবং মাঝে মাঝে গুলির আঘাতে প্রাণহানির আশঙ্কা জেলেদের মধ্যে স্থায়ী ভয় তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য, এর আগেও একাধিকবার মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ছোড়া গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক আহত বা নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত ২৭ ডিসেম্বর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের জেরে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায় একাধিকবার বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।
স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই এই সংঘাতের অংশ নয়। তবুও তাদের জীবন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া গুলি অন্য দেশের নাগরিকদের আহত করলে তা গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ঘটনায় কূটনৈতিক পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এদিকে আলমগীরের পরিবার উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য হওয়ায় তার চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় স্বজনরা। তারা সরকারের কাছে আহত জেলের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
সীমান্ত এলাকার মানুষ মনে করছেন, শুধু টহল জোরদার করলেই যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং সীমান্ত এলাকায় স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। নাফ নদীতে জেলেদের নিরাপদ বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।