গফরগাঁওয়ে দুই শিশু নিখোঁজের ঘটনায় চাঞ্চল্য: ২২ ঘণ্টা পর এক শিশুর লাশ উদ্ধার, মুক্তিপণ দাবি করেছিল অজ্ঞাত চক্র

নিজস্ব সংবাদদাতা
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৩ বার
গফরগাঁওয়ে দুই শিশু নিখোঁজের ঘটনায় চাঞ্চল্য: ২২ ঘণ্টা পর এক শিশুর লাশ উদ্ধার, মুক্তিপণ দাবি করেছিল অজ্ঞাত চক্র

প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে দুই শিশু নিখোঁজ হওয়ার ২২ ঘণ্টা পর সিফাত হাসান (১১) নামের এক শিশুর লাশ উদ্ধার হয়েছে। উপজেলার পাঁচবাগ ইউনিয়নের চর শাখচূড়া গ্রামের আব্দুর রশিদের বাড়ির পুকুরে শনিবার সকাল ১০টায় এই শিশুটির লাশ ভেসে ওঠে। স্থানীয়রা পাগলা থানা পুলিশকে খবর দিলে তারা এসে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

নিহত শিশু সিফাত হাসান ওই গ্রামের সৌদি প্রবাসী নুরুল ইসলামের ছেলে। সে চর শাখচূড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। এ ঘটনায় শোক ও ক্ষোভে স্তব্ধ পুরো গ্রাম, আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মাঝে।

শুক্রবার দুপুর থেকে নিখোঁজ ছিল সিফাত ও তার সহপাঠী আয়মান সাদাব। আয়মান দীঘির পার গ্রামের সৌদি প্রবাসী আলামিনের ছেলে। নিখোঁজের পর থেকেই দুই পরিবার সন্তানদের খোঁজে বিভিন্ন স্থানে ছুটে বেড়ালেও কোনো সন্ধান পায়নি। একপর্যায়ে শুক্রবার রাতে পাগলা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন সিফাতের পরিবার।

এদিকে, নিখোঁজের ঘণ্টাখানেক পর এক অজ্ঞাত ব্যক্তি নূরুল ইসলামের ইমু নম্বরে ফোন করে দাবি করে, সিফাতকে তারা অপহরণ করেছে এবং মুক্তিপণ হিসেবে ২০ হাজার টাকা দিতে হবে। এ সময় প্রবাসী নূরুল ইসলাম বাংলাদেশে অবস্থানরত তার ভাগনে জিসানের নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করতে বলে। পরে অপরাধীরা জিসানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিকাশে দুই হাজার টাকা চায় এবং আরেকটি নম্বরে বাকি টাকা পাঠাতে বলে। জিসান প্রথমে দুই হাজার টাকা পাঠালেও বাকি টাকা না পাঠানোয় অপরাধীরা চুপচাপ হয়ে যায়।

শনিবার সকালে যখন সিফাতের লাশ পুকুরে পাওয়া গেল, তখন পুরো গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। কান্নায় ভেঙে পড়েন সিফাতের মা কবিতা। তিনি বলেন, “ওরা আমার স্বামীর নম্বরে ফোন করে টাকা চেয়েছিল। আমরা টাকা দিয়েছি, কিন্তু তারা আমার সোনার ছেলেটারে মেরে ফেলল। আমি বিচার চাই, আমি ওদের ফাঁসি চাই।”

এদিকে এখনো নিখোঁজ আছে সিফাতের বন্ধু আয়মান সাদাব। তার নানা সুলতান মিয়া জানান, অপরাধীরা তাদের কাছেও মুক্তিপণ দাবি করেছে। “আমার মেয়েকে ফোন করে ৩০ হাজার টাকা চেয়েছে ওরা। আমরা এখনও জানি না আয়মান কেমন আছে। আল্লাহই জানেন,” — বলেন সুলতান।

পাগলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফেরদৌস আলম জানান, শিশুটির লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং তদন্ত শুরু হয়েছে। তার ভাষায়, “প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, স্থানীয় কোনো প্রতারক চক্র এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। আমরা সম্ভাব্য সব সূত্র ধরে তদন্ত চালাচ্ছি এবং খুব শিগগিরই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনব।”

এই ঘটনা স্থানীয়দের মনে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। তারা মনে করছেন, একটি শিশু অপহরণ ও হত্যার পেছনে যেভাবে মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে, তাতে গফরগাঁওয়ে সক্রিয় কোনো অপরাধী চক্র দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যেতে পারে—যারা শিশুদের টার্গেট করে অপরাধে লিপ্ত।

পুলিশ জানিয়েছে, আয়মানকে উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে প্রযুক্তির সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি পাওয়া যায়নি।

এই ঘটনাটি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একদিকে যেমন শিশুদের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে, অন্যদিকে অপরাধীদের নৃশংসতা সমাজের নৈতিক ও মানবিক অবস্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এলাকাবাসী ও নিহত শিশুর পরিবার দ্রুত বিচার ও অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছে। এখন দেখা যাক, রাষ্ট্রীয় তদন্ত কতটা দ্রুত ও কার্যকর হতে পারে এই হৃদয়বিদারক ঘটনার নিষ্পত্তিতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত