ছুটির দিনেও শীর্ষ দূষণে ঢাকা, বাড়ছে শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৯ বার
ছুটির দিনেও শীর্ষ দূষণে ঢাকা, বাড়ছে শঙ্কা

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা মহানগরীর বায়ুদূষণ নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। তবে ছুটির দিনেও যখন যানবাহন কম, কলকারখানা প্রায় বন্ধ, তখনও ঢাকার বাতাস বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীগুলোর শীর্ষে উঠে আসা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ‘আজ এই ছুটির দিনেও’—এই কথাগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাস্তবতার গভীর সংকেত। কারণ সাধারণ ধারণা অনুযায়ী, ছুটির দিনে নগরীর বাতাস কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, শুক্রবার সকালেও ঢাকার বায়ুমান কোনোভাবেই উন্নতির দিকে যায়নি; বরং আগের দিনের মতোই তা রয়ে গেছে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইকিউ এয়ারের লাইভ সূচক অনুযায়ী, আজ সকাল আটটার দিকে ঢাকার গড় বায়ুমান সূচক ছিল ২৭৩। এই মাত্রাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শুধু তাই নয়, নগরীর কিছু এলাকায় এই মাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, কোথাও কোথাও সূচক ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে, যা কার্যত ‘দুর্যোগপূর্ণ’ পরিস্থিতির কাছাকাছি। সাধারণত চলতি শুকনা মৌসুমে দিল্লি, লাহোর বা করাচির মতো শহরগুলো বায়ুদূষণে শীর্ষে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সেই শহরগুলোকে ছাড়িয়ে ঢাকা প্রায় প্রতিদিনই তালিকার শীর্ষে উঠে আসছে।

ঢাকার বায়ুদূষণের উৎস হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই যানবাহনের কালো ধোঁয়া, অবৈধ ও পুরোনো ইটভাটা, শিল্পকারখানার দূষিত নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলাবালি এবং সড়কের জমে থাকা ময়লা-ধুলোকে দায়ী করা হয়। কিন্তু ছুটির দিনে যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পরও দূষণ একই মাত্রায় থাকা প্রশ্ন তোলে—দূষণের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কোথায় ব্যর্থ হচ্ছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষণের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ধুলাবালি ও পারিপার্শ্বিক কারণে বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ম কণার আধিক্য থেকে আসে, যা হঠাৎ করে কমে না। এছাড়া নগরীর চারপাশের শিল্পাঞ্চল, ইটভাটা এবং অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও ঢাকার বাতাসকে ক্রমাগত বিষিয়ে তুলছে।

আজকের তালিকায় ঢাকার পরেই রয়েছে চীনের সাংহাই এবং ভারতের দিল্লি। সাংহাইয়ের বায়ুমান সূচক ছিল ২৩২ এবং দিল্লির ২১৬। এই তুলনা স্পষ্ট করে দেয়, দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ নগরীগুলো পরিবেশগত সংকটে কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে। তবে ঢাকার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক, কারণ এখানে দূষণ কমার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। গত ডিসেম্বর মাসজুড়ে এবং চলতি জানুয়ারিতেও প্রায় প্রতিদিনই ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় রয়েছে।

বায়ুমান সূচক ২০০ ছাড়ালে তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। এ পর্যায়ে শ্বাসযন্ত্রের রোগী, শিশু, বয়স্ক ও হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য বাইরে বের হওয়া বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। আর সূচক ৩০০ অতিক্রম করলে পরিস্থিতিকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ বলা হয়, যেখানে সুস্থ মানুষের জন্যও দীর্ঘসময় বাইরে থাকা ক্ষতিকর। আজ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যে সূচক ৪০০ ছাড়িয়েছে, তা নগরবাসীর জন্য এক নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকির বার্তা বহন করছে।

আইকিউ এয়ারের তথ্য অনুযায়ী, আজ সকালে ঢাকার অন্তত আটটি স্থানে বায়ুর মান ছিল খুবই খারাপ। নিকুঞ্জের এএসএল সিস্টেমস লিমিটেড এলাকায় সূচক ছিল ৪২২, যা নগরীর মধ্যে সর্বোচ্চ। ধানমন্ডিতে সূচক ৩০০ ছুঁয়েছে, ইস্টার্ন হাউজিং ও দক্ষিণ পল্লবীতে ছিল ২৮৫, বে’জ এজওয়াটারে ২৮১, বেচারাম দেউড়িতে ২৮০, গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এলাকায় ২৭৩ এবং গোড়ানে ২২৪। এই পরিসংখ্যান দেখায়, দূষণ শুধু শিল্পাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়; আবাসিক এলাকাগুলোও সমানভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে।

বায়ুদূষণের প্রভাব ধীরে ধীরে হলেও গভীর। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে শ্বাস নিলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যায়, হাঁপানি ও ব্রঙ্কাইটিসের মতো রোগ বাড়ে, এমনকি হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। শিশুদের ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এই ঝুঁকি বহুগুণ বেশি, কারণ এখানে কোটি মানুষ প্রতিদিন একই দূষিত বাতাস গ্রহণ করছে।

দেশে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময় নানা প্রকল্প ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকাকে ঘিরে কিছু কার্যক্রম চালু থাকলেও বাস্তবে তার ফল খুব একটা চোখে পড়ছে না। ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের নির্গমন পরীক্ষা, নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণের মতো উদ্যোগ কাগজে-কলমে থাকলেও মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ দুর্বল। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ঢাকার বাইরের অনেক এলাকাতেও এখন বায়ুদূষণের মাত্রা দ্রুত বাড়ছে, অথচ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এখনো মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আইকিউ এয়ার নগরবাসীর জন্য কিছু সতর্কতামূলক পরামর্শ দিয়েছে। আজকের মতো বায়ুমান থাকলে বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করা জরুরি। খোলা জায়গায় দৌড়ানো বা ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। বাসাবাড়ির জানালা যতটা সম্ভব বন্ধ রাখা এবং ঘরের ভেতরে পরিষ্কার বাতাস বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এসব পরামর্শ তাৎক্ষণিক সুরক্ষায় সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে সমাধানের জন্য প্রয়োজন কার্যকর নীতি, কঠোর প্রয়োগ এবং নাগরিক সচেতনতা।

ছুটির দিনেও ঢাকার আকাশ যখন স্বস্তির নিশ্বাস নিতে দেয় না, তখন প্রশ্ন উঠছে—এই নগরী কি ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে? বায়ুদূষণ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি সরাসরি মানুষের জীবনমান, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে হলে কেবল পরিসংখ্যান প্রকাশ নয়, বরং সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। নইলে ‘ছুটির দিনেও শীর্ষ দূষণে ঢাকা’—এই শিরোনাম হয়তো আরও দীর্ঘদিন আমাদের বাস্তবতার অংশ হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত