প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর উত্তরায় বৃহস্পতিবার রাতের একটি ঘটনা আবারও আলোচনায় এনেছে বরিশালের ছাত্ররাজনীতি, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ভূমিকা এবং অতীত রাজনৈতিক সহিংসতার প্রসঙ্গ। বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের সাবেক ভিপি ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কলেজ শাখার সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মঈন তুষারকে স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিতর্ক ও মামলার সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে থাকলেও রাজধানীতে এইভাবে জনতার হাতে আটকের ঘটনা নতুন করে কৌতূহল ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাতে উত্তরা আধুনিক মেডিকেল হাসপাতালের সামনে অবস্থান করছিলেন মঈন তুষার। এ সময় স্থানীয় কয়েকজন তাকে শনাক্ত করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হলে স্থানীয় জনতা তাকে আটক করে এবং পরে উত্তরা পশ্চিম থানায় খবর দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে হেফাজতে নেয় এবং থানায় নিয়ে যায়। রাতেই বিষয়টি নিশ্চিত করেন উত্তরা পশ্চিম থানার অফিসার ইনচার্জ মো. রফিক আহমেদ।
ওসি রফিক আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। পরিস্থিতি যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার দিকে না যায়, সে জন্য তাকে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি থানায় আছেন এবং বিষয়টি আইন অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এই মুহূর্তে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মঈন তুষারের নাম বরিশালের রাজনীতিতে নতুন নয়। তিনি বরিশাল সরকারি বিএম কলেজের ছাত্ররাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিলেন এবং একসময় কলেজের ভিপি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রলীগের রাজনীতিতে তার উত্থান ঘটে প্রয়াত বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরনের ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে। হিরনের রাজনৈতিক বলয়ের ভেতরে থেকেই তিনি কলেজ ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন এবং স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে তার রাজনৈতিক জীবন ছিল বিতর্কে ভরা। বরিশাল বিএম কলেজের নতুন অধ্যক্ষ শংকর চন্দ্র দত্তকে মারধরের অভিযোগসহ একাধিক সহিংস ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার কথা স্থানীয়ভাবে আলোচিত। এসব ঘটনায় কখনো প্রকাশ্যে মামলা, কখনো প্রশাসনিক তদন্তের খবর এলেও, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক বিষয়ই শেষ পর্যন্ত ধামাচাপা পড়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা। এই কারণেই তার নাম ছাত্র ও শিক্ষক মহলের একাংশের কাছে আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
এছাড়া মঈন তুষারের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্ট মামলাসহ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একাধিক মামলার তথ্য পাওয়া যায়। যদিও এসব মামলার বর্তমান অবস্থা নিয়ে থানার পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, তার বিরুদ্ধে অতীতে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর নথি যাচাই করা হচ্ছে। জনতার হাতে আটকের ঘটনার পর সেগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বরিশালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মঈন তুষারের অবস্থান গত কয়েক বছর ধরেই দুর্বল হয়ে পড়ে। তার রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুর পর তিনি কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন। অন্যদিকে বরিশালের আরেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য ও সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর সঙ্গে তার রক্তশুল ও দ্বন্দ্ব ছিল বলে স্থানীয় রাজনীতিতে বহুল আলোচিত। এসব কারণে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তিনি ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে খুব একটা দেখা যেত না।
ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ ঘোষণার পর মঈন তুষারের মতো নেতাদের অবস্থান আরও জটিল হয়ে ওঠে। একসময় যে সংগঠনটি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন হিসেবে পরিচিত ছিল, সেটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর অনেক সাবেক নেতাই আত্মগোপনে চলে যান অথবা রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে চলতে শুরু করেন। মঈন তুষারও দীর্ঘদিন বরিশালে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। হঠাৎ করে রাজধানীর উত্তরায় তার উপস্থিতি এবং সেখানেই জনতার হাতে আটক হওয়ার বিষয়টি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, তাকে আটকের সময় উত্তেজনা তৈরি হলেও বড় কোনো সংঘর্ষ হয়নি। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে। অনেকে বলছেন, যদি পুলিশ সময়মতো না আসত, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে জনতার হাতে অপরাধী সন্দেহে আটক করে পুলিশের কাছে তুলে দেওয়ার ঘটনা বাড়ছে, যা একদিকে সচেতনতার ইঙ্গিত দিলেও অন্যদিকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে, মঈন তুষারের আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বরিশাল ও ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ একে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ফল হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা ঠিক নয়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জনতার হাতে আটক হলেও শেষ পর্যন্ত আইন অনুযায়ী তদন্ত ও বিচারই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।
থানা সূত্র জানায়, মঈন তুষারের বিরুদ্ধে বর্তমানে কী কী অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তার নামে থাকা পুরোনো মামলাগুলোর অবস্থা, ওয়ারেন্ট আছে কি না এবং সাম্প্রতিক কোনো অভিযোগ যুক্ত হবে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে—ছাত্ররাজনীতির নামে সহিংসতা ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে নিষিদ্ধ সংগঠনের সাবেক নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। মঈন তুষারের আটকের ঘটনা সেই আলোচনাকে আরও উসকে দিল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সব মিলিয়ে, উত্তরায় জনতার হাতে আটক হওয়া মঈন তুষারের ঘটনা শুধু একজন সাবেক ছাত্রনেতার ব্যক্তিগত সংকট নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি, দলীয় প্রভাব এবং আইনের শাসন নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নের প্রতিফলন। এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে এগোয় এবং এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর পুনরাবৃত্তি রোধে কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় কি না।