রাষ্ট্রের কাছে একটাই দাবি—হাদি হত্যার ন্যায়বিচার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৭ বার
হাদি হত্যার ন্যায়বিচার দাবি

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির যোদ্ধা শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার চেয়ে রাষ্ট্রের কাছে হৃদয়বিদারক আবেদন জানিয়েছেন তাঁর স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম শম্পা। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে নীরব যন্ত্রণা আর অপেক্ষার প্রহর গুনে চলা এই তরুণী শুক্রবার বিকেলে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে দেওয়া একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর আবেগঘন পোস্টে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন—রাষ্ট্রের কাছে তাঁর এবং তাঁর সন্তানের একমাত্র দাবি ন্যায়বিচার।

হাদি হত্যার ন্যায়বিচার দাবি

ফেসবুক পোস্টে রাবেয়া ইসলাম শম্পা লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রের কাছে আমি এবং আমার সন্তানের একমাত্র দাবি—আমার স্বামী শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার।’ কয়েকটি শব্দে প্রকাশ করা এই দাবি যেন এক দীর্ঘশ্বাসের মতো সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। তিনি আরও লিখেছেন, ‘জাগতিক সব চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে ওসমান হাদি হত্যার ন্যায়বিচার।’ এই বক্তব্যে স্পষ্ট, কোনো আর্থিক সহায়তা, কোনো বিশেষ সুবিধা কিংবা প্রতিশ্রুতি নয়—তিনি চান শুধু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার।

এর আগেও, গত বুধবার, একই দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন হাদির স্ত্রী। ধারাবাহিক এই আহ্বান থেকে বোঝা যায়, সময় গড়ালেও তাঁর বেদনা কমেনি; বরং ন্যায়বিচারের অপেক্ষা তাঁকে আরও দৃঢ় করে তুলেছে। স্বামীকে হারানোর শোকের মধ্যেও তিনি কণ্ঠ তুলেছেন রাষ্ট্রের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে—যে দায়িত্ব নাগরিকের জীবন রক্ষা এবং অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা।

ওসমান হাদি ছিলেন জুলাই আন্দোলনের একজন পরিচিত মুখ। আন্দোলনের সময় রাজপথে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তিনি অনেক তরুণের কাছে সাহস ও প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। বয়স মাত্র ৩২ বছর। রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার পাশাপাশি তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বা মতাদর্শের বাইরে গিয়েও অনেকেই তাঁকে একজন দৃঢ়চেতা নাগরিক হিসেবে দেখতেন, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পাননি।

গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়নগরে দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন ওসমান হাদি। প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, সেদিন রাতে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গুরুতর আহত হাদিকে প্রথমে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তিন দিন পর তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। দেশ ছাড়ার সময় অনেকেই আশা করেছিলেন, আধুনিক চিকিৎসা হয়তো তাঁকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু সব প্রত্যাশা ভেঙে দিয়ে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক মহল থেকে শোকবার্তা আসে। ঢাকায় তাঁর জানাজায় লাখো মানুষ অংশ নেন—যা তাঁর জনপ্রিয়তা ও মানুষের ভালোবাসারই প্রতিফলন। জানাজার পর জাতীয় কবির কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। এই দাফন যেন তাঁকে ইতিহাসের এক প্রতীকী জায়গায় স্থাপন করে, যেখানে কবিতা, প্রতিবাদ আর ত্যাগের স্মৃতি মিলেমিশে থাকে।

কিন্তু এই শোকের আবহের মধ্যেও একটি প্রশ্ন ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে—হাদির হত্যার বিচার কোথায় দাঁড়িয়ে? তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য সামনে আসেনি বলে অভিযোগ করছেন তাঁর স্বজন ও সমর্থকেরা। এই প্রেক্ষাপটে রাবেয়া ইসলাম শম্পার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া আবেদন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না, বরং পুরো সমাজে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। বিশেষ করে যাঁরা সামাজিক আন্দোলন বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব। হাদির মতো একজন পরিচিত আন্দোলনকর্মীর হত্যার বিচার বিলম্বিত হলে তা নাগরিক সমাজে ভীতির পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

রাবেয়া ইসলাম শম্পার পোস্টে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি তাঁর সন্তানের ভবিষ্যতের কথাও ভাবছেন। একজন শিশু যখন তার বাবাকে হারায় সহিংসতার শিকার হয়ে, তখন সেই শিশুর কাছে ন্যায়বিচার কেবল আইনি বিষয় নয়; এটি তার মানসিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। মায়ের এই আহ্বান আসলে সন্তানের পক্ষ থেকেও একটি প্রশ্ন—এই রাষ্ট্র কি তার বাবার হত্যার বিচার করবে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাদির স্ত্রীর পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর অসংখ্য মানুষ সেখানে সমর্থন জানাচ্ছেন। অনেকেই মন্তব্যে লিখেছেন, তারা এই দাবির সঙ্গে একাত্ম। কেউ কেউ দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন, আবার কেউ রাষ্ট্রের নীরবতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলো প্রমাণ করে, হাদির হত্যাকাণ্ড এখন আর শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি জনস্বার্থের একটি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন, এই ধরনের ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত ও নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে সহিংসতার সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত হতে পারে। তারা বলছেন, রাষ্ট্র যদি দৃষ্টান্তমূলকভাবে এই হত্যার বিচার করে, তাহলে তা ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

সব মিলিয়ে, রাবেয়া ইসলাম শম্পার আবেদন একটি সাধারণ নারীর আকুতি হলেও তার তাৎপর্য অনেক গভীর। এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার প্রশ্ন, আইনের শাসনের প্রশ্ন এবং মানবিকতার প্রশ্ন। জাগতিক সব চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি যে ন্যায়বিচার চেয়েছেন, সেটিই এখন এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্র কীভাবে এই দাবির জবাব দেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে হাদির পরিবার, তাঁর সহযোদ্ধারা এবং ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী অসংখ্য মানুষ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত