নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৫ বার

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মিলিত পদক্ষেপের পক্ষে বাংলাদেশের সুদৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেছেন, দায়িত্বশীল প্রতিবেশী রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সক্রিয় সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ সবসময় আলোচনা, আস্থা বৃদ্ধি এবং সহযোগিতামূলক সমাধানের মাধ্যমে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্বাসী।

শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টস (সাফা) আয়োজিত ‘নেক্সট জেনারেশন প্রফেশন : কনভার্জিং এথিক্যাল এআই অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্টিং’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এই সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক হিসাব পেশার শীর্ষ নেতৃত্ব একত্রিত হন, যা বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান বিশ্ব একাধিক অভিন্ন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, সরবরাহব্যবস্থার চাপ, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একক কোনো দেশের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এ প্রেক্ষাপটে একটি নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা এবং সম্মিলিত বৈশ্বিক পদক্ষেপই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ সবসময় বহুপাক্ষিকতার পক্ষে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দেয়।

মো. তৌহিদ হোসেন উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ স্থিতিশীলতা, আস্থা এবং সহযোগিতামূলক সমাধান জোরদারে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ অন্যান্য বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।

সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা নৈতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং টেকসই রিপোর্টিংয়ের সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন দ্রুতগতিতে বিশ্বব্যাপী পেশাগত কাঠামো বদলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থার ওপর বৈশ্বিক গুরুত্ব বাড়ছে। এই বাস্তবতায় নৈতিক এআই এবং টেকসই রিপোর্টিং একত্রে কাজ না করলে ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও পেশাজগৎ বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জন্য প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়নের সমন্বয় শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক সংহতি জোরদার করার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ চায় এমন এক প্রবৃদ্ধির ধারা, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক, পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘমেয়াদে সহনশীল।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা পেশাজীবীদের উদ্দেশে বলেন, ভবিষ্যতের বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা যথেষ্ট নয়। নৈতিক দৃঢ়তা, পেশাগত সততা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হিসাববিদ ও আর্থিক পেশাজীবীদের ভূমিকা আরও বেড়েছে, কারণ তাদের কাজের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা, বাজারের স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে।

তিনি সাফা সম্মেলনের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এ ধরনের আয়োজন জ্ঞানের আদান-প্রদান, সেরা পন্থা ভাগ করে নেওয়া এবং অর্থবহ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে সহায়ক। দক্ষিণ এশিয়া এবং এর বাইরের দেশগুলোর বিশেষজ্ঞ, পেশাজীবী ও চিন্তাবিদদের একত্রিত হতে দেখে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।

সম্মেলনে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা বলেন, বৈশ্বিকভাবে অ্যাকাউন্টিং পেশা একটি নতুন যুগে প্রবেশ করছে। নৈতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং টেকসই রিপোর্টিংয়ের সমন্বয় ব্যবসায়িক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এবং জনসাধারণের আস্থাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। প্রযুক্তি নির্ভর এই রূপান্তর সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে তা নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে বলে তারা সতর্ক করেন।

সাফা সম্মেলনে আফগানিস্তান, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সম্মেলনে তিনটি টেকনিক্যাল অধিবেশন এবং একটি সমাপনী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে এআই, টেকসই রিপোর্টিং এবং নৈতিকতার বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীর আলোচনা হয়।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান এ এইচ এম আহসান বলেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি একদিকে যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে, অন্যদিকে তেমনি নতুন চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসে। তিনি বলেন, এআই-চালিত সিস্টেম দক্ষতা বৃদ্ধি ও কমপ্লায়েন্স জোরদার করতে পারে, তবে শক্তিশালী নৈতিক সুরক্ষা না থাকলে এগুলো অ্যালগরিদমিক যোগসাজশ, অস্বচ্ছতা এবং বর্জনমূলক চর্চার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূইয়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে টেকসই রিপোর্টিংয়ের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিবেদন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

এই সম্মেলনের বিশেষ আকর্ষণ ছিল ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টস (আইএফএসি)-এর সভাপতি জ্যঁ বুকোর উপস্থিতি। আইসিএবি’র আমন্ত্রণে এই প্রথম তিনি ঢাকায় অনুষ্ঠিত কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেন। জ্যঁ বুকো বলেন, সততা ও জনস্বার্থকে কেন্দ্র করে এআই পরিচালিত হলে হিসাববিদরা অনিশ্চয়তাকে সুযোগে রূপান্তর করতে পারবেন এবং আরও টেকসই ও সহনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতি গঠনে অবদান রাখতে পারবেন।

আইসিএবি সভাপতি এন কে এ মোবিন স্বাগত বক্তব্যে বলেন, এই সম্মেলন দক্ষিণ এশিয়ার পেশাজীবীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন কমিটির চেয়ারম্যান ও আইসিএবি’র সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ ফরহাদ হোসেনও সম্মেলনের তাৎপর্য তুলে ধরেন।

সম্মেলনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইসিএবি’র সাবেক সভাপতি ও রহমান রহমান হক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের সিনিয়র পার্টনার আদীব হোসেন খান। তিনি বলেন, টেকসই প্রতিবেদন ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আর ভবিষ্যতের ধারণা নয়, এটি ইতোমধ্যেই অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি, পরিমাপ ও প্রকাশের কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। তিনি পেশাজীবী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও মান নির্ধারকদের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান, যাতে এআই-সক্ষম টেকসই রিপোর্টিং স্বচ্ছ, ব্যাখ্যাযোগ্য এবং বৈশ্বিক মান ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত