গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর প্রচারে কর্মচারীদের বাধা নেই: আলী রীয়াজ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৮ বার
গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর প্রচারে কর্মচারীদের বাধা নেই: আলী রীয়াজ

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন গণভোটকে কেন্দ্র করে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়ে যে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট ভাষায় নাকচ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ওপর কোনো আইনগত নিষেধাজ্ঞা নেই। বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় নাগরিক হিসেবে তাঁদের দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকা স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়।

রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে শনিবার অনুষ্ঠিত গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ–সংক্রান্ত বিভাগীয় কর্মকর্তা-প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আলী রীয়াজ। ঢাকা বিভাগীয় প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সভায় সরকারি প্রশাসনের শীর্ষ ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর দপ্তরের সিনিয়র তথ্য অফিসার মাহবুবুর রহমান তুহিনের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সভার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

আলী রীয়াজ তাঁর বক্তব্যে বলেন, এবারের গণভোট কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় যাওয়া বা কাউকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার আয়োজন নয়। এটি হলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত ‘জাতীয় সনদ’-নির্ভর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জনগণের সরাসরি সম্মতি নেওয়ার প্রক্রিয়া। তাঁর ভাষায়, এটি এমন এক গণভোট, যেখানে নির্ধারিত হবে আগামীর বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে এবং কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালানো নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি ও অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি একবাক্যে এই মত পেয়েছেন যে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ওপর কোনো আইনগত বাধা নেই। যাঁরা এ বিষয়ে ভিন্ন কথা বলছেন, তাঁরা হয় বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন, নয়তো ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে এই বিষয়টি সামনে আনছেন।

তিনি আরও বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী নন; তাঁরা একই সঙ্গে এই দেশের নাগরিক। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিরা জনগণের সেবায় সর্বদা নিয়োজিত থাকবেন এবং নাগরিক হিসেবে আইন মানা, শৃঙ্খলা রক্ষা ও জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করবেন। সেই সাংবিধানিক দায়িত্বের আলোকে গণভোটে জনগণকে সচেতন করা, ভোটের অর্থ ব্যাখ্যা করা এবং ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করা নাগরিক কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।

আলী রীয়াজ তাঁর বক্তব্যে বলেন, আজকের সিদ্ধান্ত আগামী অন্তত ৪০ বছরের বাংলাদেশের পথ নির্ধারণ করবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যে ব্যক্তিতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দেশে প্রতিষ্ঠিত ছিল, তার বিরুদ্ধে মানুষ সংগ্রাম করেছে, প্রাণ দিয়েছে, জেল-জুলুম সহ্য করেছে, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে। সেই আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশের মানুষ দুটি সুস্পষ্ট দায়িত্ব রেখে গেছে। একটি হলো—ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র যেন আর কখনো ফিরে আসতে না পারে, সেই পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা। অন্যটি হলো—ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক পথনকশা নির্মাণ করা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ, ২৭ থেকে ৩৭ বছরের নিচে। এই তরুণ প্রজন্মই আগামী কয়েক দশক দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই আজ যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তার প্রভাব দীর্ঘকাল ধরে সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় পড়বে। দুর্বার গতিতে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এখনই সঠিক ভিত্তি নির্মাণ জরুরি।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর এই সরকার তিনটি স্পষ্ট ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ করছে—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। সরকার নির্বাচন আয়োজন করে না, বরং নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করে। নির্বাচন পরিচালনা করবে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। একইভাবে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করবে, সরকার শুধু বিচারপ্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

সংবিধান সংশোধনের অতীত ইতিহাস তুলে ধরে আলী রীয়াজ বলেন, আগে এক ব্যক্তির ইচ্ছায় সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনের সময় জাতীয় সংসদের যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেখানে একটি রাজনৈতিক দল ছাড়া অন্য কোনো দলের প্রতিনিধি ছিল না। বহু বৈঠকের পরও কমিটির সিদ্ধান্ত এক বৈঠকে পরিবর্তিত হয়, যা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। তাঁর একক সিদ্ধান্তেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়। সংবিধান যেন আর কখনো ব্যক্তির ইচ্ছার খেলনায় পরিণত না হয়, সে জন্যই গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া হচ্ছে।

মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার বলেন, সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত ৪৮টি সুপারিশ চারটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে গণভোটে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে কার্যত প্রশ্ন একটাই—মানুষ জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে, না বিপক্ষে। তিনি সতর্ক করে বলেন, গণভোট ব্যর্থ হলে ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে, যা আগের চেয়েও ভয়াবহ ও নির্মম রূপ নিতে পারে।

মনির হায়দার আরও বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, গত ৫৪ বছরে তা পূরণ হয়নি। বরং ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থে স্বাধীনতাকে বারবার অপব্যবহার করা হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থান সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে, আর গণভোট সেই সুযোগ কাজে লাগানোর ঐতিহাসিক মাধ্যম।

সভায় বক্তারা গণভোট নিয়ে জনগণের মধ্যে বিদ্যমান বিভ্রান্তির কথাও তুলে ধরেন। দীর্ঘদিন ভোট নিয়ে অনাস্থার কারণে অনেক মানুষের কাছে গণভোট একটি নতুন অভিজ্ঞতা। তাই ব্যালটে কীভাবে ভোট দিতে হবে, ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের অর্থ কী—এসব বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝানোর ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা। গণভোটের ব্যালটে ‘টিক’ চিহ্নকে কেন্দ্রীয় প্রতীক ধরে মানুষকে ভোটকেন্দ্রে আনতে উদ্বুদ্ধ করার আহ্বান জানানো হয়।

ঢাকা বিভাগের কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পূর্তসচিব মো. নজরুল ইসলাম, পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিকসহ ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাঁদের আলোচনায় স্পষ্ট হয়, গণভোটকে ঘিরে প্রশাসনের প্রস্তুতি ও ভূমিকা নির্ধারণে এই মতবিনিময় সভা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত