শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী আজ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৮ বার
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জন্মবার্ষিকী

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক, বাংলাদেশের আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম রূপকার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আজ ৯০তম জন্মবার্ষিকী। জাতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত এই রাষ্ট্রনায়কের জন্মদিন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, বিশেষ করে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনগুলো নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করছে। দিবসটি উপলক্ষে বিএনপি দুদিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে এবং দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পৃথক বাণী দিয়েছেন।

জিয়াউর রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলায়। তার ডাকনাম ছিল কমল। বাবা মনসুর রহমান ছিলেন একজন রসায়নবিদ এবং মা জাহানারা খাতুন রানী। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা জিয়াউর রহমানের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে তৎকালীন ব্রিটিশ ও পরবর্তী পাকিস্তান শাসনামলের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। এই সময়ই তার ব্যক্তিত্বে শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের বীজ রোপিত হয় বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা।

১৯৫৩ সালে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সামরিক জীবনের শুরু থেকেই তিনি পেশাদারিত্ব, সততা ও নেতৃত্বগুণের জন্য পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি শুধু মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণই করেননি, বরং অন্যতম সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সরাসরি রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে ‘জেড ফোর্স’, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার পর চট্টগ্রামে বিদ্রোহ ঘোষণা এবং পরবর্তীতে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা জিয়াউর রহমানকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এই ঘোষণা শুধু সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও মুক্তিযুদ্ধে এক নতুন গতি সঞ্চার করে। বহু গবেষক মনে করেন, এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ একটি সুসংগঠিত জাতীয় প্রতিরোধে রূপ নেয়।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২৫ আগস্ট জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। একই বছরের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ তাকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের শাসনামল বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত। তার হাত ধরেই দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তিত হয়। রাজনৈতিক দল গঠনের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি ভিন্ন এক দর্শনের সূচনা করেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। এই দল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি ‘উৎপাদনের রাজনীতি’ ধারণাকে সামনে আনেন, যা কৃষি, শিল্প ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেয়।

তবে জিয়াউর রহমানের জীবন যেমন বর্ণাঢ্য, তেমনি তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্কও কম নয়। বিশেষ করে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দীর্ঘ সময় ধরে তাকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় ও দলীয় পর্যায়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অবদান এমনকি তার শাহাদতের ঘটনাকেও বিতর্কিত করার চেষ্টা হয়েছে। বীরউত্তম খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্ত, পাঠ্যপুস্তক ও রাষ্ট্রীয় ইতিহাস থেকে তার ভূমিকা খাটো করে উপস্থাপনের উদ্যোগ এসব বিতর্ককে আরও উসকে দেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান খান এই প্রসঙ্গে বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে জিয়াউর রহমানকে ইতিহাসের খলচরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি। তার মতে, মানুষের স্মৃতি ও ইতিহাসের গভীরে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এতটাই প্রোথিত যে রাজনৈতিক প্রচারণা দিয়ে তাকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অবদান নতুন করে মূল্যায়িত হচ্ছে।

ড. সিদ্দিকুর রহমান মনে করেন, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম সর্বজনীন ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি এবং তার শাসনামলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছিল। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পরিবর্তন, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণার প্রবর্তন এবং কৃষি ও শিল্পে উৎপাদনমুখী নীতিই তার রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও জিয়াউর রহমানের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব, গার্মেন্ট শিল্পের সূচনা এবং বিদেশে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার মাধ্যমে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের ভিত্তি স্থাপন—এসবই আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। পাশাপাশি তার পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি মর্যাদাশীল অবস্থান অর্জন করে।

শহীদ জিয়াউর রহমানের চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব নিয়েও আলোচনা হয় তার জন্মবার্ষিকীতে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে বলেন, দেশপ্রেম, সাহস, সততা ও সহজ-সরল জীবনযাপন ছিল জিয়াউর রহমানের মূল বৈশিষ্ট্য। তার মতে, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ দর্শনই দেশের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি পরিচয় তুলে ধরে, যা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রেরণা জোগায়।

জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি দুদিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আজ ১৯ জানুয়ারি সকালে তার কবরে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতিহা পাঠ করবেন। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

আগামী দিনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে কীভাবে ইতিহাসে মূল্যায়ন করা হবে—সে প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তার জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছে। জন্মবার্ষিকীর এই দিনে তার অবদান স্মরণ করতে গিয়ে রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে উঠে ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ ও সত্যনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলাই হবে সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত