প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফের ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এক সময় যেটি পাহাড়, বন ও শিল্পাঞ্চল ঘিরে স্বাভাবিক জনপদ ছিল, সেই সলিমপুর ইউনিয়নের ছিন্নমূল এলাকা এখন ক্রমেই সন্ত্রাসী তৎপরতার আতঙ্কজনক কেন্দ্রস্থলে পরিণত হচ্ছে। সোমবার বিকেলে র্যাব–৭–এর একটি অভিযানে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হয়েছেন বিজিবির নায়েব সুবেদার আব্দুল মেতালেব। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন র্যাবের আরও দুই সদস্য এবং একজন গোপন তথ্যদাতা বা সোর্স। এই হত্যাকাণ্ডে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
র্যাব–৭ সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সলিমপুর ইউনিয়নের ছিন্নমূল এলাকায় একটি অফিসকক্ষে একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী লুকিয়ে থাকার তথ্য পাওয়া যায়। ওই তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার বিকেলে ১৬ সদস্যের একটি বিশেষ দল অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের অংশ হিসেবে চারজন সদস্য ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন। ঠিক সেই সময় আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া একদল সশস্ত্র ব্যক্তি চারদিক থেকে ঘিরে ধরে র্যাব সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
প্রথমেই হামলাকারীরা নায়েব সুবেদার আব্দুল মেতালেবের ব্যবহৃত অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও র্যাব সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর খুব কাছ থেকে তাঁর পায়ে গুলি চালানো হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। সহকর্মীরা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। দায়িত্ব পালনকালে এভাবে একজন অভিজ্ঞ নিরাপত্তা কর্মকর্তার মৃত্যু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনায় আহত দুই র্যাব সদস্যকে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। আহত হয়েছেন র্যাবের সঙ্গে কাজ করা একজন সোর্সও, যিনি অভিযানের আগে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছিলেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সলিমপুরের ছিন্নমূল ও আশপাশের জঙ্গলঘেরা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড় দখল, অবৈধ বসতি স্থাপন, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রের দাপট নিয়ে সংঘর্ষ চলছে। শিল্পাঞ্চল ও বন্দরনির্ভর এলাকায় অবস্থানের কারণে এখানে অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে অভিযান হলেও তারা বারবার সংগঠিত হয়ে ফিরে আসে।
এই এলাকাটি এর আগেও আলোচনায় এসেছিল। ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট সেনাবাহিনী গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে একই ছিন্নমূল এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। ওই অভিযানে একটি সক্রিয় দেশীয় অস্ত্র তৈরির কারখানা আবিষ্কৃত হয়। সেখান থেকে ছয়টি দেশীয় অস্ত্র, ৩৫টি খালি কার্তুজ, পাঁচটি তাজা কার্তুজ, চাইনিজ কুড়াল, ছুরি, ওয়াকিটকি, মেগাফোনসহ বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। সে সময় চারজন সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়েছিল। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ওই অভিযানের পর সাময়িকভাবে তৎপরতা কমলেও পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এবারের ঘটনায় সেই আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একের পর এক সহিংস ঘটনায় স্পষ্ট হচ্ছে, ছিন্নমূল এলাকা আবারও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয় ঘাঁটি হয়ে উঠছে। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, ঘন জঙ্গল ও অবৈধ স্থাপনার কারণে এলাকাটি নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য অপারেশন পরিচালনায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
র্যাব–৭–এর এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিযানের সময় পরিস্থিতি অত্যন্ত দ্রুত বদলে যায়। আমাদের সদস্যরা চারদিক ঘিরে ফেললেও ‘কন্ট্রোলড ফায়ার’ করার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। আশপাশে সাধারণ মানুষ ও ঘন বসতি থাকায় গুলি চালানো হলে আরও বড় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার পর সন্ত্রাসীরা মুহূর্তের মধ্যে আক্রমণ করে, যা প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
র্যাব–৭-এর সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এ আর এম মোজাফফর হোসেন জানান, ঘটনার পরপরই ছিন্নমূল এলাকা ও আশপাশে অতিরিক্ত র্যাব, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এলাকায় চিরুনি অভিযান চলছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, যারা এই নৃশংস হামলার সঙ্গে জড়িত, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
নিহত নায়েব সুবেদার আব্দুল মেতালেবের সহকর্মীরা তাঁকে একজন সাহসী ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করেছেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁর এভাবে প্রাণ হারানো সহকর্মীদের মধ্যে শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে হাসপাতাল ও কর্মস্থল এলাকায় হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীতাকুণ্ডের মতো শিল্প ও বন্দরসংলগ্ন এলাকায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পুনরুত্থান শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগজনক। পাহাড় দখল ও অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন। শুধু অভিযান নয়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনাই হতে পারে কার্যকর সমাধান।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর একের পর এক হামলা প্রমাণ করে, এলাকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে। তাঁরা চান, অস্থায়ী অভিযান নয়, বরং স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। পাহাড় ও জঙ্গলঘেরা এই এলাকায় অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসীদের চলাচল বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে।
সীতাকুণ্ডে র্যাব কর্মকর্তার নিহত হওয়ার এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে—সন্ত্রাস দমনে বর্তমান কৌশল কতটা কার্যকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আপাতত পুরো এলাকা নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে থাকলেও, এই ঘটনার রেশ যে দীর্ঘদিন দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা আলোচনায় প্রভাব ফেলবে, তা বলাই যায়।