প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা শিবিরে আবারও নেমে এলো আগুনের বিভীষিকা। গভীর রাতে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শফিউল্লাহ কাটা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অন্তত তিন শতাধিক ঝুপড়ি ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনে কোনো প্রাণহানি না হলেও কয়েক হাজার রোহিঙ্গা পরিবার এক মুহূর্তেই সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হয়েছে। শীতের রাতে মাথার ওপর ছাউনি হারিয়ে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের অসহায় চিত্র আরও একবার মানবিক সংকটের গভীরতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দিবাগত রাত আনুমানিক তিনটার দিকে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের শফিউল্লাহ কাটা ১৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৪ ব্লকে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রথমে একটি ব্র্যাক পরিচালিত শিখন কেন্দ্র বা লার্নিং সেন্টারে আগুন জ্বলে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যেই দাহ্য বাঁশ, ত্রিপল ও প্লাস্টিকের তৈরি আশপাশের শেড ও ঝুপড়ি ঘরগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ আগুনের লেলিহান শিখা আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী পুরো ব্লকজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
ক্যাম্পবাসীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার সঠিক কারণ তারা কেউই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না। কেউ বলছেন বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে, আবার কেউ সন্দেহ করছেন খোলা আগুন বা চুলার আগুন থেকেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে নিশ্চিত কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে অনেক পরিবার ঘর থেকে প্রয়োজনীয় কিছু বের করার সুযোগও পায়নি। জীবন বাঁচাতে নারী ও শিশুকে কোলে নিয়ে ছুটে যেতে হয়েছে নিকটবর্তী খোলা মাঠ ও নিরাপদ স্থানের দিকে।
একজন রোহিঙ্গা নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, “ঘুমের মধ্যেই আগুনের চিৎকার শুনে উঠি। দেখি চারদিকে আগুন। সন্তানদের নিয়ে দৌড়ে বের হই। ঘরের ভেতরে সব কিছু পুড়ে গেছে—খাবার, কাপড়, কাগজপত্র কিছুই নেই।” এমন বেদনাদায়ক গল্প শুধু একজনের নয়, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারেরই বাস্তবতা প্রায় একই।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে উখিয়া ও টেকনাফ ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। ক্যাম্পের ভেতরের সরু পথ, পানির স্বল্পতা ও দাহ্য বসতিগুলোর ঘনবসতির কারণে আগুন নেভাতে চরম বেগ পেতে হয় দমকলকর্মীদের। প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে ক্যাম্পের একাধিক ব্লকের তিন শতাধিক ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। আগুনের তাপে বহু জায়গায় বাঁশের কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে পোড়া ছাই ও ধোঁয়ার গন্ধ।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন মাস্টার ডলার ত্রিপুরা জানান, আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও তাৎক্ষণিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে ক্যাম্পের দাহ্য অবকাঠামো বড় ভূমিকা রেখেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ঘটনার পরপরই সক্রিয় ভূমিকা নেয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আগুন লাগার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করে। ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে সবচেয়ে বড় যে সংকটটি তৈরি হয়েছে, তা হলো আশ্রয় ও মানবিক সহায়তার। যেসব পরিবার তাদের ঘর হারিয়েছে, তারা এখন খোলা জায়গায় কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ে অবস্থান করছে। শীতের রাতে শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন মানবিক সংস্থা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে এবং জরুরি ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নতুন নয়। গত কয়েক বছরে বারবার আগুন লেগে হাজার হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর সকালে ৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডে একটি হাসপাতাল পুড়ে যায়, যা চিকিৎসা সেবায় বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছিল। এর আগের দিন, ২৫ ডিসেম্বর রাতে কুতুপালং নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুনে অন্তত ১০টির বেশি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব ঘটনায় প্রাণহানি কম হলেও ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ড ক্যাম্পবাসীদের জীবনে স্থায়ী আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর অস্থায়ী কাঠামো, অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক সংযোগ, গ্যাস বা খোলা চুলার ব্যবহার এবং ঘনবসতি অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি শীত মৌসুমে আগুনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়াও একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে কাজ করছে। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও প্রশস্ত রাস্তার অভাবের কারণে আগুন লাগলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, রোহিঙ্গারা শুধু একটি দেশের নাগরিকত্বহীন জনগোষ্ঠীই নয়, বরং তারা এখন বহুমাত্রিক মানবিক সংকটের মুখে। সহিংসতা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, খাদ্য ও স্বাস্থ্য সংকটের পাশাপাশি বারবার অগ্নিকাণ্ড তাদের জীবনকে আরও অনিরাপদ করে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে ক্যাম্পে অগ্নিনিরাপত্তা জোরদার করা এবং টেকসই আশ্রয়ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি নতুন করে উঠেছে।
উখিয়ার শফিউল্লাহ কাটা ক্যাম্পের এই অগ্নিকাণ্ড আবারও প্রমাণ করল, রোহিঙ্গা সংকট শুধু আশ্রয়ের প্রশ্ন নয়, বরং এটি একটি চলমান মানবিক বিপর্যয়। প্রতিটি আগুনের সঙ্গে পুড়ে যায় মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি আর সামান্য নিরাপত্তার অনুভূতি। এখন দেখার বিষয়, এই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে কতটা নিরাপদ ও মানবিক করে তোলা যায়।