৩ ভোটও নেই, তবু নির্বাচন ঠেকানোর হুমকি: মির্জা ফখরুল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৯৩ বার
সিটি করপোরেশন নির্বাচন তথ্য

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন উত্তাপ বাড়ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে কঠোর ভাষায় নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ভোটের মাঠে যাদের বাস্তব সমর্থন নেই, যাদের তিনটি ভোটও নেই, তারাই বড় গলায় নির্বাচন হতে দেবে না বলে হুমকি দিচ্ছে—এমন মন্তব্য করে তিনি রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, বিএনপি নির্বাচন নিয়ে কোনো দ্বিধা বা সংশয়ের জায়গায় নেই; বরং দলটি জনগণের রায়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে প্রস্তুত।

মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন মির্জা ফখরুল। সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি সরাসরি নির্বাচনবিরোধী বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন এবং বলেন, নির্বাচনের আর মাত্র ২৩ দিন বাকি। এই সময়ে এসে কেউ কেউ বলছে নির্বাচন হবে না, তারা বাধা দেবে, নির্বাচন করতে দেবে না। অথচ খোঁজ নিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, তাদের নিজের ভোটই নেই তিনটা।

বিএনপি মহাসচিবের কণ্ঠে ছিল স্পষ্ট আত্মবিশ্বাস। তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচন নিয়ে আতঙ্কিত নয়, বরং উন্মুখ হয়ে আছে। কারণ এই দল বিশ্বাস করে জনগণের শক্তিতে। জনগণের কাছে যাওয়ার মধ্য দিয়েই বিএনপি নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা প্রমাণ করতে চায়। জনগণ যদি বিএনপিকে গ্রহণ করে, তাহলে সরকার গঠন করবে বিএনপি। আর যদি জনগণ প্রত্যাখ্যান করে, তবে বিরোধী দলে বসে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথেই চলবে দলটি। তার প্রশ্ন, আগেভাগে এত হুমকি-ধমকি আর গলাবাজির কী প্রয়োজন?

মির্জা ফখরুলের বক্তব্যে উঠে আসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কথাও। তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি দুষ্টামি করছে সেই সব শক্তি, যারা এক সময় বাংলাদেশকেই স্বীকার করেনি। যারা দেশের স্বাধীনতার সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগিতা করেছে, মা-বোনদের তুলে দিয়েছে, গণহত্যায় অংশ নিয়েছে—এই ইতিহাস বিএনপি ভুলে যায়নি। তার ভাষায়, এই দেশের মানুষও সেই ইতিহাস ভুলে যায়নি। বহু ত্যাগ, রক্ত আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আজ একটি জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ নষ্ট করার ষড়যন্ত্রই এখন চলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে মির্জা ফখরুল বলেন, সামনে নির্বাচন মানেই শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ। দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের ভোটাধিকার সংকুচিত ছিল, গণতন্ত্রের জায়গা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এখন সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ তৈরি হয়েছে। এই পথকে যারা রুদ্ধ করতে চায়, তারা আসলে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব।

সংস্কার প্রসঙ্গেও সরব ছিলেন মির্জা ফখরুল। সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে সরকারের প্রচারণার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, বিএনপি এই সংস্কারের কথা নতুন করে বলেনি। বিএনপি দুই বছর আগেই ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে। তার দাবি, আজ যারা সংস্কারের কথা বলছে, তারা আসলে বিএনপির দেওয়া প্রস্তাবেরই প্রতিধ্বনি করছে। তার ভাষায়, সংস্কার তো বিএনপির সন্তান। বিএনপি বহু আগেই রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছে।

আলোচনা সভায় জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ও অবদান নিয়েও কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, শহীদ জিয়া শুধু একজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা। একদলীয় শাসন থেকে দেশকে বের করে এনে তিনি মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজ যারা নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে বড় বড় কথা বলছে, তাদের উচিত ইতিহাসের দিকে তাকানো এবং শহীদ জিয়ার আদর্শ থেকে শিক্ষা নেওয়া।

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, বিএনপি কোনো সহিংসতার রাজনীতি চায় না। দলটি শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। কারণ বিএনপি বিশ্বাস করে, ভোটের মাধ্যমেই রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, নির্বাচন নিয়ে ভয়ভীতি ও হুমকির রাজনীতি আসলে একটি অগণতান্ত্রিক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। গণতন্ত্রে বিশ্বাস থাকলে নির্বাচনের মাঠে এসে জনগণের মুখোমুখি হতে হয়।

তার বক্তব্যে বারবার ফিরে আসে জনগণের কথা। তিনি বলেন, এই দেশের মালিক জনগণ। জনগণই ঠিক করবে কে ক্ষমতায় যাবে, কে বিরোধী দলে বসবে। জনগণের রায় ছাড়া অন্য কোনো পথ গ্রহণযোগ্য নয়। যারা নির্বাচন ঠেকাতে চায়, তারা মূলত জনগণের এই অধিকার কেড়ে নিতে চায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্য আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট করেছে। একদিকে নির্বাচনমুখী বার্তা, অন্যদিকে নির্বাচনবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভাষা—দুই মিলিয়ে বিএনপি নিজেদের আত্মবিশ্বাসী ও প্রস্তুত হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। একই সঙ্গে দলটি জনগণের সামনে নিজেদের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি জোরালো করতে সচেষ্ট।

আলোচনা সভা শেষে উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে নতুন সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তার একটি বড় অংশ নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ ও অবস্থানের ওপর। সেই প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুলের বক্তব্য শুধু একটি দলীয় মন্তব্য নয়, বরং চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি শক্ত অবস্থান হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে যে টানাপোড়েন চলছে, তার মধ্যেই বিএনপি মহাসচিবের এই বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভোটের মাঠে শক্তি প্রমাণের আহ্বান, ইতিহাসের দায় স্মরণ করানো এবং সংস্কার নিয়ে নিজেদের দাবিকে সামনে আনা—এই তিনটি দিক দিয়েই বক্তব্যটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত