শীতের মাঝেই বাড়ছে তাপমাত্রা, চলতি বছরে তীব্র গরমের শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৬ বার
শীতের মাঝেই বাড়ছে তাপমাত্রা

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে চলতি বছরের শুরুতেই আবহাওয়ায় অস্বাভাবিকতার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। বছরের শীতলতম মাস জানুয়ারিতেও স্বাভাবিক শীতের দেখা নেই; বরং দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় চার থেকে পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি থাকছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আগামী কয়েকদিনে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতিকে তারা ‘স্বাভাবিক নয়’ বলে উল্লেখ করছেন। আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা চলতে থাকলে চলতি বছর দেশে তীব্র গরমের আশঙ্কা রয়েছে এবং অতীতের অনেক রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে।

উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, জানুয়ারি মাস সাধারণত দেশের সবচেয়ে শীতল সময় হলেও এবার দিনের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে উপকূলীয় অঞ্চল, এমনকি উত্তরাঞ্চলেও শীতের তীব্রতা অনুপস্থিত। বরং রোদেলা দিনে গরমের অনুভূতি পাওয়া যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য যেমন বিস্ময়কর, তেমনি উদ্বেগজনকও। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চিত্র জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবেরই একটি বহিঃপ্রকাশ।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন নেসা জানান, গত মঙ্গলবার সারা দেশের মধ্যে টেকনাফে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ঢাকায় ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তিনি বলেন, এই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। তাঁর মতে, বায়ুদূষণের পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বছরের এই সময়ে সাধারণত শীতের প্রভাব বেশি থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুক মনে করছেন, কয়েকদিন আগে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একটি গভীর নিম্নচাপও এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাঁর ভাষায়, ওই নিম্নচাপের প্রভাবে বাংলাদেশসহ আশপাশের অঞ্চলে বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন এসেছে, ফলে হঠাৎ করেই তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশের কোথাও শৈত্যপ্রবাহ নেই এবং তাপমাত্রা কমার মতো তেমন কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না, যা শীতকালীন আবহাওয়ার জন্য অস্বাভাবিক।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ এস এম কামরুল হাসান বলেন, গত তিন বছর ধরেই বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, গত ২৯ ডিসেম্বর দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রার মধ্যে খুব কম পার্থক্য ছিল, যা গত ৭৩ বছরের আবহাওয়া রেকর্ড অনুযায়ী একটি অস্বাভাবিক ঘটনা। সাধারণত শীতকালে দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান বেশি থাকে, কিন্তু এবার তা হয়নি। বর্তমানে দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে চার থেকে পাঁচ ডিগ্রি বেশি থাকছে, যা কোনোভাবেই স্বাভাবিক আবহাওয়া হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অস্বাভাবিক উষ্ণতার প্রভাব কেবল আবহাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও। শীতকালীন ফসলের উৎপাদনে সমস্যা দেখা দিতে পারে, কারণ অনেক ফসল নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে শীতের রোগব্যাধির ধরনও বদলে যেতে পারে। শীত কম থাকলেও দিনের বেলায় বেশি গরমে পানিশূন্যতা, ক্লান্তি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।

জলবায়ু বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, যদি বছরের শুরুতেই এমন উষ্ণতা বিরাজ করে, তবে গ্রীষ্মকালে তাপপ্রবাহ আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, শীতকালে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে পরবর্তী গ্রীষ্মে তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ে। সে ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলে ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব আরও প্রকট হতে পারে, যেখানে কংক্রিট ও বায়ুদূষণের কারণে তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় বেশি থাকে।

সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই অস্বাভাবিক আবহাওয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। রাজধানীর বাসিন্দারা বলছেন, জানুয়ারিতে যেখানে মোটা কাপড় ছাড়া বাইরে বের হওয়া কষ্টকর হওয়ার কথা, সেখানে এখন হালকা পোশাকেই চলাফেরা করা যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলেও কৃষকরা বলছেন, শীতের স্বাভাবিক ছন্দ না থাকায় তারা ফসলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। কেউ কেউ এটিকে ‘ঋতুচক্রের ভাঙন’ বলেও উল্লেখ করছেন।

পরিবেশবিদরা মনে করছেন, বায়ুদূষণ কমানো, সবুজায়ন বাড়ানো এবং জলবায়ু অভিযোজনমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। তা না হলে তাপমাত্রার এই অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট ডেকে আনতে পারে। তারা সতর্ক করে বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়; এর প্রভাব ইতোমধ্যেই বর্তমানের বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।

সব মিলিয়ে, শীতের মাঝেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে চার থেকে পাঁচ ডিগ্রি বেশি থাকা শুধু একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বড় সতর্ক সংকেত। চলতি বছরে তীব্র গরমের শঙ্কা যে বাস্তব, তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনগুলোতে দেশের মানুষকে আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত