নির্বাচনে দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ, ইসির ভূমিকা প্রশ্নে এনসিপি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৮ বার
নির্বাচনে দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ, ইসির ভূমিকা প্রশ্নে এনসিপি

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নির্বাচনী মাঠে উত্তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অভিযোগ করেছেন, নির্বাচন কমিশন সব প্রার্থীর ক্ষেত্রে সমান আচরণ করছে না। তার ভাষায়, একদিকে এনসিপির প্রার্থী নাহিদ ইসলামের বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ দেওয়া হলেও, অন্যদিকে বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের প্রকাশ্য নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির পরও নির্বাচন কমিশন নীরব ভূমিকা পালন করছে। এই পরিস্থিতিকে তিনি ‘দ্বৈত মানদণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

বুধবার ঢাকার সেগুনবাগিচায় বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারের সময়সূচি শুরু হওয়ার আগেই বিভিন্ন প্রার্থীর কর্মকাণ্ড নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সে প্রসঙ্গ টেনে তিনি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনের জন্য প্রতীক বরাদ্দের পরদিন থেকেই প্রচার শুরু করার বিধান থাকলেও, তার আগেই কিছু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও কর্মকাণ্ড আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ ওঠে।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের উদ্দেশে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি ফ্ল্যাট নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার মতে, এটি নির্বাচনী আচরণবিধি ও আইন লঙ্ঘনের শামিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই ধরনের সরাসরি প্রতিশ্রুতির পরও কেন নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। অথচ তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বের একটি ঘটনায় এনসিপির প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে।

তার ভাষায়, “আমরা দেখতে পাচ্ছি, নাহিদ ইসলামকে শোকজ দেওয়া হয়। অথচ তারেক রহমান যখন প্রকাশ্যে এই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেড়াচ্ছেন, তখন নির্বাচন কমিশন নিশ্চুপ থাকে। এটা কি সমান আচরণ?” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইসির নিরপেক্ষতা ও সমতার নীতি প্রশ্নবিদ্ধ করেন।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। তিনি দাবি করেন, প্রশাসনের ভেতরেও এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব কাজ করছে। তার মতে, প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য বড় হুমকি। তিনি বলেন, “এখানে বৈষম্যমূলক নীতি দেখা যাচ্ছে। তারেক রহমানের বেলায় এক নীতি, আর অন্য প্রার্থীদের বেলায় আরেক নীতি।”

ঢাকা-৮ আসনে শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তার দল জাতীয় নাগরিক পার্টি এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গড়ে অংশ নিচ্ছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়তি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি জানান, ঢাকা-৮ আসনে তার নির্বাচনী প্রচারের মূল দুটি এজেন্ডা থাকবে। এর একটি হলো ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা।

এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শহীদ ওসমান হাদি যে ‘ইনসাফের ঢাকা-৮’ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নই তাদের লক্ষ্য। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারত্বমুক্ত একটি সমাজ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, এমন বাংলাদেশ গড়তে চান যেখানে আর কোনো মানুষকে হাদি ভাইয়ের মতো প্রাণ দিতে না হয় বা হারিয়ে যেতে না হয়।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জানান, বৃহস্পতিবার শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তার নির্বাচনী প্রচার শুরু করবেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এনসিপি কোনো পেশিশক্তিনির্ভর বা টাকানির্ভর রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। তার মতে, সাম্প্রতিক গণ–অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ একটি সুন্দর ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছে, এবং সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

শোকজ নোটিশ প্রসঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি জানান, গণভোটের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে তিনি একটি ব্যানার টানিয়েছিলেন, যেখানে কোনো নির্বাচনী প্রতীক বা প্রার্থীর নাম ছিল না। তবুও নির্বাচন কমিশন তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। তার প্রশ্ন, যদি এটি আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়, তাহলে প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি ও জনসমক্ষে রাজনৈতিক ঘোষণা কীভাবে উপেক্ষিত থাকে।

আরও গুরুতর অভিযোগ করে তিনি বলেন, সেই ব্যানার অপসারণের সময় সিটি করপোরেশনের কর্মী, বিএনপির লোকজন ও ম্যাজিস্ট্রেট একসঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। তার ভাষায়, “প্রশাসন ও বিএনপি যদি একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা কে দেবে?” এই মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযোগগুলো আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে আস্থার সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের ওপর নিরপেক্ষতা বজায় রাখার যে সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে, তা কতটা কার্যকরভাবে পালন করা হচ্ছে—এই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে।

একদিকে ক্ষমতাসীন ও বড় দলগুলোর কর্মকাণ্ড, অন্যদিকে ছোট ও নতুন দলগুলোর অভিযোগ—সব মিলিয়ে নির্বাচনী পরিবেশ দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যে স্পষ্ট, এনসিপি এই নির্বাচনকে কেবল একটি ক্ষমতার লড়াই হিসেবে নয়, বরং ন্যায়বিচার ও ইনসাফের প্রশ্ন হিসেবেও দেখছে। তবে নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগগুলোর কী জবাব দেয় এবং কীভাবে নিরপেক্ষতার প্রশ্নে আস্থা ফেরায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত