বেতন বাড়ানো অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ার নয়: ড. রিপন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৪ বার
বেতন বাড়ানো অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ার নয়: ড. রিপন

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সংস্কার ও রাষ্ট্র পরিচালনার নামে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি কিংবা এ ধরনের বড় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ নয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের একমাত্র বৈধ অধিকার রয়েছে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ইকোনমিক গভর্নেন্স অ্যান্ড এন্টি করাপশন’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ড. রিপন এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এই সংলাপে দেশের অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, বর্তমান সরকারকে জনগণ ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনেনি। ফলে তাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ সুগম করা এবং সীমিত আকারে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সংস্কারের অজুহাতে তারা এমন সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা সরাসরি জনগণের জীবন ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িত। বেতন বাড়ানো, নতুন নীতিমালা প্রণয়ন কিংবা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া—এসবই একটি নির্বাচিত সরকারের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে বড় সংকট হলো জবাবদিহিতার অভাব। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নয়—এমন একটি সরকার যদি বড় সিদ্ধান্ত নিতে থাকে, তাহলে সেটি গণতন্ত্রের জন্য ভয়ংকর নজির হয়ে দাঁড়াবে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যতে যে কোনো সরকারই স্বৈরাচারী পথে হাঁটতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

সংলাপে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন বিএনপির এই শীর্ষ নেতা। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে এমপি প্রার্থীরা সাধারণ মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে ভোট চান, কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। সংসদ সদস্য হোস্টেলকে অনেকেই স্থায়ী আবাসে পরিণত করেন এবং সেখানে নানা ধরনের অনৈতিক ও অনিয়মিত কর্মকাণ্ড চলে। এসব অনিয়ম বন্ধে শক্তিশালী ও কার্যকর জবাবদিহি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।

ড. রিপনের মতে, জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে এলাকার মানুষের সরাসরি যোগাযোগ ও দায়বদ্ধতা না থাকলে গণতন্ত্র কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। তিনি বলেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ছাড়া জনগণের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব নয়।

সংলাপে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, এই অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় দুর্নীতি দমন ও ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা ছিল প্রধান আলোচ্য বিষয়। কিন্তু সরকার এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে কতটা সফল হয়েছে, সে বিষয়ে জাতির সামনে কোনো সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ চিত্র তুলে ধরা হয়নি।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান প্রস্তাব করেন, সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয় যেন তাদের কার্যক্রম ও অর্জনের একটি বিস্তারিত ‘রিপোর্ট কার্ড’ প্রকাশ করে। এতে জনগণ জানতে পারবে সরকার কী করেছে, কী পারেনি এবং কোন জায়গায় ব্যর্থতা রয়ে গেছে। ভবিষ্যতের জন্য এসব রিপোর্ট ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, আমলাদের ভূমিকা হওয়া উচিত জনবান্ধব ও সহায়ক, কিন্তু বাস্তবে তারা দিন দিন আরও ক্ষমতাবান হয়ে উঠছেন। প্রশাসনিক এই জটিলতা ও হয়রানিই দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি দমনে কেবল আইন নয়, প্রশাসনিক সংস্কারও জরুরি বলে তিনি মত দেন।

সংলাপে অংশ নেওয়া অন্যান্য বক্তারাও দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সুগম করা। দীর্ঘ সময় ধরে এমন সরকার বহাল থাকলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজস্ব আয়, বাজেট ঘাটতি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা জড়িত। এ ধরনের সিদ্ধান্ত যদি একটি অস্থায়ী সরকার নেয়, তাহলে ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের জন্য তা বড় চাপ তৈরি করতে পারে।

ড. রিপনের বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদিকে সরকার সংস্কারের কথা বলছে, অন্যদিকে বিরোধী দল বলছে—সংস্কারের নামে ম্যান্ডেটবহির্ভূত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন প্রশ্ন একটাই—দেশের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেবে কে, এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে।

সব মিলিয়ে, এই সংলাপ আবারও সামনে এনে দিয়েছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার মৌলিক প্রশ্নগুলো। নির্বাচিত সরকার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ও প্রভাবশালী সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসংগত—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে দেশবাসী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত