প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এমসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও ১০ দলীয় জোটের শাপলা কলির পঞ্চগড়-১ আসনের প্রার্থী সারজিস আলম। তাঁর ভাষায়, এখন আর শুধু কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা শ্রেণির মানুষ নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের মানুষই পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, হতাশা ও বঞ্চনার পর সাধারণ মানুষ নতুন এক বাস্তবতা ও নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশা করছে বলেও তিনি মনে করেন।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) দুপুরে পঞ্চগড় পৌরসভার চিনিকল মাঠে আয়োজিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও ১০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নির্বাচনী জনসভার প্রস্তুতি পরিদর্শনে গিয়ে এসব কথা বলেন সারজিস আলম। আগামী দিনের রাজনৈতিক আন্দোলন ও নির্বাচনী কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই জনসভাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এই জনসভা শুধু একটি নির্বাচনী আয়োজন নয়, বরং এটি মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, আশা ও আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশের মঞ্চ হয়ে উঠবে।
সারজিস আলম তাঁর বক্তব্যে বিগত সময়ের রাজনীতির কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, অতীতে এমন অনেক রাজনীতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন, যারা জনগণের কাছে গিয়ে নিজেদের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের অনেকের কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের জন্য ছিল ভোগান্তির কারণ। মাঠপর্যায়ে তাঁদের অনুসারী ও সমর্থকদের মাধ্যমে মানুষ নির্যাতিত হয়েছে, জুলুমের শিকার হয়েছে, হয়রানির মুখে পড়েছে। এই অভিজ্ঞতা মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে এবং সেই ক্ষত থেকেই আজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিক থেকে শুরু করে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ—যার কাছেই যাওয়া হোক না কেন, সবার মাঝেই পরিবর্তনের কথা শোনা যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, মানুষের বিবেকের মধ্যে যে অভ্যুত্থান ও বিপ্লবের বার্তা পৌঁছে গেছে, সেটিই এখন রাজনীতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। মানুষ আর শুধু দলীয় পরিচয়, প্রতীক কিংবা পারিবারিক প্রভাব দেখে ভোট দেবে না। বরং তারা যাচাই করবে কে তাদের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়িয়েছে, কে সব সময় কাছে ছিল, আর কে অন্তত ক্ষতি করেনি।
নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন জায়গায় হুমকি ও ভয়ভীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে সারজিস আলম বলেন, এখনো কিছু মানুষ ও গোষ্ঠী পুরোনো কৌশলেই রাজনীতি করতে চাইছে। ভোট না দিলে নির্বাচনের পরে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে, এমনকি মামলা থেকে নাম কাটানোর জন্য অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এবার মানুষ এসব কর্মকাণ্ড মেনে নেবে না। যারা এখনো ধমকি দিচ্ছে ও ভয় দেখাচ্ছে, মানুষ তাদের বয়কট করবে।
সারজিস আলমের মতে, জনবিমুখ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মানুষের এই বয়কটই হবে আগামী দিনের রাজনীতির বড় পরিবর্তন। তিনি দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের পঞ্চগড়ে আগমন এবং তাঁর নেতৃত্বে আয়োজিত জনসভা একটি বড় গণজোয়ার সৃষ্টি করবে। সেই গণজোয়ার শুধু পঞ্চগড়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড় থেকে শুরু করে সর্ব দক্ষিণের জেলা কক্সবাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। তাঁর ভাষায়, এই ১০ দলীয় ঐক্যজোট ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায় এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়েই আগামীর বাংলাদেশে সরকার গঠন করবে।
তিনি আরও বলেন, আগামীকাল শুক্রবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আমিরে জামায়াতের নির্বাচনী জনসভায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি হবে বলে তাঁরা আশাবাদী। এই জনসমাগম প্রমাণ করবে যে, সাধারণ মানুষ আর নিরব দর্শক হয়ে থাকতে চায় না; তারা নিজেরাই পরিবর্তনের অংশ হতে চায়।
এ সময় সারজিস আলমের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পঞ্চগড় জেলা জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির ইকবাল হোসাইন, জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা নির্বাচন কমিটির প্রধান পরিচালক মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন, শহর জামায়াতের সেক্রেটারি নাসির উদ্দিন সরকার এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক শিশির আসাদসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। তাঁরা সবাই জনসভার প্রস্তুতি ঘুরে দেখেন এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিজেদের দায়িত্ব ও পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই জনসভা শুধু একটি নির্বাচনী প্রচারণা নয়, বরং উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু হতে যাওয়া ধারাবাহিক নির্বাচনী জনসভার সূচনা। পঞ্চগড় চিনিকল মাঠের এই কর্মসূচির মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের উত্তরবঙ্গ সফর শুরু হবে। এই সফরে দলীয় ও জোটভুক্ত প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণার পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে জনমত গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের যে কথা শোনা যাচ্ছে, সারজিস আলমের বক্তব্য সেই প্রবণতারই প্রতিফলন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতা, শাসনব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে রাজনীতির দূরত্ব মানুষকে নতুন বিকল্পের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে পরিবর্তনের ডাক শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক আচরণ ও নির্বাচনী পরিবেশের ওপর।