নির্বাচনি প্রচারে সহিংসতা: নিরাপত্তা শঙ্কায় জামায়াত জোট

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২৩ বার

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একদিকে উৎসবমুখর প্রচারণা শুরু হলেও অন্যদিকে বাড়ছে আতঙ্ক, উদ্বেগ এবং গভীর নিরাপত্তা শঙ্কা। দীর্ঘদিন পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আবহে মাঠে নেমেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী, নেতাকর্মী এবং সমর্থকেরা। পোস্টার, লিফলেট, পথসভা ও জনসংযোগে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরতে শুরু করেছে বহু এলাকায়। তবে সেই আনন্দের আবহ ক্রমেই ছাপিয়ে যাচ্ছে সহিংসতা, অস্ত্রের ব্যবহার এবং হামলার আশঙ্কা। বিশেষ করে জামায়াত জোটের প্রার্থী ও বিরোধী দলগুলোর নেতাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এখন প্রকাশ্য উদ্বেগে রূপ নিয়েছে।

নির্বাচনি প্রচারের প্রথম দিকেই ঘটে যাওয়া একাধিক সহিংস ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে চরম উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। বিএনপির এক নেতাকে গুলির ঘটনা এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর নির্বাচনি সমাবেশের আশপাশ থেকে অস্ত্রসহ সন্দেহভাজনদের আটকের খবর পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এসব ঘটনার ফলে নির্বাচনি মাঠে থাকা প্রার্থীরা নিজেদের জীবন ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। অনেকেই বলছেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই অদৃশ্য আতঙ্ক যেন পিছু ছাড়ছে না।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকেই সব ধরনের হত্যা, সন্ত্রাস এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আসছে। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা সরকারের প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার জনগণের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, যাতে ভোটাররা কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।

এই উদ্বেগের মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা-৭ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হাফেজ এনায়েত উল্লাহকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি। ঘটনাটি রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির আব্দুস সবুর ফকির এক বিবৃতিতে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিবৃতিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, তফসিল ঘোষণার একদিন পর আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত জুলাইযোদ্ধা শহীদ শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যা করা হলেও এখনো সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত হয়নি। এতে সন্ত্রাসীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তি ও নির্বাচনি প্রার্থীদের টার্গেট করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট বানচাল করার জন্য গোপন আঁতাতের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র চলছে, যা গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ হুমকি।

ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনায় জামায়াত প্রার্থী হাফেজ এনায়েত উল্লাহ জানান, বৃহস্পতিবার রাতে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে আয়োজিত তাঁর নির্বাচনি সমাবেশে সন্দেহজনকভাবে তিনজন ব্যক্তি ঘোরাফেরা করছিল। তাদের একজনের গায়ে আওয়ামী লীগের লোগোযুক্ত গেঞ্জি ছিল বলে তিনি দাবি করেন। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তাঁর দেহরক্ষীরা সতর্ক হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে সন্দেহভাজন তিনজনের মধ্যে দুজনকে আটক করা সম্ভব হলেও অপর একজন পিস্তলসহ পালিয়ে যায়। আটক দুজনের কাছ থেকে ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয় এবং তাদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে একই রাতে চকবাজার থানার সামনে এলাকাবাসী ও জামায়াত নেতাকর্মীরা বিক্ষোভে অংশ নেন।

নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ শুধু জামায়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন নির্বাচনি প্রচারে চরম নিরাপত্তা সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে একের পর এক গুলির ঘটনা ঘটছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার কার্যত উদাসীন ভূমিকা পালন করছে। নির্বাচনের দায়িত্ব এখন কেবল সরকারের নয়, নির্বাচন কমিশনেরও। কিন্তু বাস্তবে তাদের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আরিফুর রহমান তুহিন আরও বলেন, যখন প্রার্থীরাই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত, তখন সাধারণ মানুষের অবস্থা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাঁর মতে, অতীতে আওয়ামী লীগের শাসনামলে যেসব অস্ত্র লুট হয়েছিল, সেগুলোর বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। উপরন্তু নতুন করে দেশে অস্ত্র প্রবেশের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, না হলে নির্বাচনের পরিবেশ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনপিও। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করার জন্য পরিকল্পিত গুপ্ত হামলা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঢাকার কেরানীগঞ্জে দলীয় কার্যালয়ের সামনে কেরানীগঞ্জ মডেল উপজেলার হযরতপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাসান মোল্লাকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। এই ঘটনায় তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং হামলাকারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানান।

মির্জা ফখরুলের মতে, এসব ঘটনার সঠিক বিচার না হলে সন্ত্রাসীরা আরও বড় ধরনের নাশকতা চালাতে উৎসাহিত হবে। তিনি হাসান মোল্লাসহ অন্যান্য নেতাকর্মীর ওপর হামলার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানান। বিএনপির পক্ষ থেকেও নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরাপদ করতে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোটারদের অংশগ্রহণ, প্রার্থীদের মুক্তভাবে প্রচার এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। নতুবা আতঙ্কের এই আবহ ভোটের ফলাফল ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ উভয়ের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমান বাস্তবতায় সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। জনগণের প্রত্যাশা, আসন্ন নির্বাচন যেন সহিংসতা নয়, বরং শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা ও গণতান্ত্রিক উৎসবের মাধ্যমে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত