ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে সাইবার প্রতারণা ও অপারেটরের দায় এড়ানো

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৯ বার
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে সাইবার প্রতারণা

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে সাইবার প্রতারণার মাত্রাও ক্রমবর্ধমান। বিশেষ করে খোদ ব্যাঙ্কিং ও মোবাইল অপারেটরদের দুর্বল নিরাপত্তা কাঠামো এবং তথ্যের সুরক্ষা ব্যবস্থা অনীহা জনিত কারণে সাধারণ মানুষ আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে। ভুয়া অ্যাপ, অনলাইন জুয়া এবং ফিশিং টোপের মাধ্যমে প্রতারণাকারীরা সহজেই গ্রাহকের সম্পদ দখল করছে।

সম্প্রতি সাংবাদিকদের কাছে তথ্য দেওয়া এক প্রাইভেট ব্যবসায়ীর অভিজ্ঞতা এ প্রবণতার বাস্তবতা তুলে ধরেছে। তিনি জানান, একটি ব্যাগে প্রায় ৬০ হাজার দেশীয় অপারেটরের সিমকার্ড রয়েছে, যেগুলোকে ব্যবহার করে অনলাইন প্রতারণা চালানো হচ্ছে। এসব সিমে কারো নাম বা পরিচয় ব্যবহার করা হতে পারে, যার মাধ্যমে প্রতারকরা সহজেই গ্রাহকের মোবাইল ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার পান। এসব সিম ব্যবহার করে তৈরি করা ভুয়া ও জুয়ার অ্যাপের নোটিফিকেশন মানুষের মোবাইল ফোনে পাঠানো হয়, যাতে “আপনি ৫ লাখ টাকা জিতেছেন” বা “১০ লাখ টাকা জিতেছেন” ধরনের নকল বার্তা আসে। একবার কেউ এতে ফাঁদে পড়ে গেলে তার সম্পদ হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, “বর্তমানে কোনো এজেন্ট বা ব্যাংকিং সিস্টেম যদি সাইবার প্রতারণার শিকার হয়, তারা প্রাথমিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করছে। নিজের নীতিমালার আড়ালে অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাহকের তথ্যের অজানা প্রয়োজনে অপরাধীকে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “কল স্পুফিং বা ফোন নম্বর ক্লোনের মতো কৌশল ব্যবহার করে প্রতারকরা যে কারো নাম ও নম্বর ব্যবহার করে নজরদারি করছে এবং ফ্রড করছে।”

ডিএমপির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুণ অর রশীদও নিশ্চিত করেছেন, “অনলাইন প্রতারণার সব মূল উৎস হচ্ছে সিমকার্ড। এখানে কোনো ‘ছোট ঘটনা’ নেই, প্রতিটি সিম নিবন্ধিত এবং আইনের আওতায়।” তিনি বলেন, সাধারণ মানুষকে সচেতন করা এবং প্রতারণা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পর্যাপ্ত তথ্য প্রদান নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকও স্বীকার করেছে যে, ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম বা অনলাইন অর্থনৈতিক অপরাধ দিন দিন বাড়ছে। ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তা বিবেচনায় ব্যাংক ও এমএফএস-অপারেটরদের লাইসেন্স দেওয়া হয়। তাই ডিজিটাল নিরাপত্তার দায়িত্ব তাদের।” তিনি আরও বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবুও গ্রাহককে সচেতন হতে হবে।”

বাংলাদেশের গ্রাহকরা এখন এমন একটি বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন যেখানে মোবাইল সিমের ক্লোন, ভুয়া অ্যাপ এবং নকল বার্তা শুধু অর্থ নয়, ব্যক্তিগত তথ্য ও ব্যাঙ্কিং ডেটাও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অপারেটর ও ব্যাংকের দায় এড়ানো গ্রাহক ও অর্থনৈতিক খাতের নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এছাড়া অনলাইন প্রতারণার ক্ষেত্রে গ্রাহক সচেতনতার অভাবও একটি বড় সমস্যা। প্রতারণাকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অ্যাপের মাধ্যমে দ্রুত মানুষের ভেতরে বিশ্বাস জন্মিয়ে ফাঁদ পাতা শুরু করে। যখন কেউ প্রথমবার প্রতারণার শিকার হয়, তার পর পরই বৃহৎ পরিমাণ অর্থ হারায় এবং অনেক ক্ষেত্রে তথ্য বিদেশে পাচার হয়।

প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলেন, সিম কার্ড এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দুর্বলতা দূর করতে হবে। ব্যাংকিং ও মোবাইল অপারেটরদের অবশ্যই গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা, কল স্পুফিং রোধ, নিরাপদ লেনদেন এবং ফ্রড মনিটরিংয়ের জন্য শক্তিশালী প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাহককেও সতর্ক থাকতে হবে এবং কোনো অনলাইন জুয়ার বা বিনিয়োগের টোপে ফাঁদে না পড়ার শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।

এই সমস্যার সমাধান না হলে দেশের ডিজিটাল আর্থিক খাত ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠবে। গ্রাহক, ব্যাংক এবং মোবাইল অপারেটরের যৌথ সচেতনতা ছাড়া ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখা সম্ভব নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত