পানিকে কৌশলগত অস্ত্র বানাচ্ছে ভারত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬২ বার
বাংলাদেশের বিপক্ষে পানিকে হাতিয়ার বানিয়েছে ভারত

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েন চলছে। কূটনৈতিক সৌজন্য, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা কিংবা যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) বৈঠক—সব পথেই একাধিকবার চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু বাস্তবতায় কাঙ্ক্ষিত কোনো অগ্রগতি নেই। বরং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মতে, উজানের দেশ হিসেবে ভারত পানি ইস্যুকে ক্রমেই কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, যৌথ নদী কমিশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র নিশ্চিত করেছে, অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টনের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির কথা তুলে ধরে ভারতকে একাধিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। এসব চিঠিতে শুষ্ক মৌসুমে ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা, বর্ষায় আকস্মিকভাবে বাঁধ খুলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি না করা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠকের আহ্বান জানানো হলেও দিল্লির পক্ষ থেকে কার্যত কোনো ইতিবাচক সাড়া আসেনি।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বহু বছর ধরেই বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে উজানে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করা হয়, আবার বর্ষাকালে হঠাৎ করে বাঁধ খুলে দিয়ে নিম্নাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করা হয়। এসব বিষয়ে নিয়মিতভাবে ভারতকে অবহিত করা হলেও তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, কারিগরি পর্যায়ে মাঝে মাঝে বৈঠক হলেও মন্ত্রী বা সচিব পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় বসতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না ভারত। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।

জেআরসির বৈঠকের পর কার্যত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে সর্বশেষ কারিগরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পদ্মা বা গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন ছাড়াও ধরলা, দুধকুমার, গোমতী, খোয়াই, মনু ও মুহুরীসহ অন্তত ১৪টি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অভিন্ন নদীর ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হলেও বৈঠকের পর থেকে দিল্লির সঙ্গে আর কোনো কার্যকর যোগাযোগ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী ডিসেম্বরের দিকে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। অথচ চুক্তি বলবৎ থাকা অবস্থাতেই বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত পানি পাচ্ছে না। মেয়াদ শেষ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তিস্তা নদীর অবস্থা আরও শোচনীয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উজানে অবৈধভাবে বাঁধ নির্মাণ করে ভারত প্রায় পুরো পানিপ্রবাহ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে যেখানে শুষ্ক মৌসুমে অন্তত ১০ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা, সেখানে অনেক সময় ২০০ কিউসেকও পাওয়া যায় না। এতে উত্তরাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে মরুকরণের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, তিস্তা নিয়ে কার্যত কোনো আলোচনা নেই। উল্টো কুশিয়ারা নদী থেকে বাংলাদেশ সেচের জন্য পানি তুলতে গেলে ভারত বাধা দিচ্ছে। এমনকি ফেনী, তিতাসসহ সীমান্তবর্তী একাধিক নদীতে শিল্পবর্জ্য ফেলার অভিযোগও রয়েছে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির সভাপতি মোস্তফা কামাল মজুমদার এই পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘পানি আগ্রাসন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতিকে উপেক্ষা করে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করছে। বর্ষায় বাঁধ খুলে ফসল ধ্বংস করা হচ্ছে, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে দিয়ে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশকে।

তিনি বলেন, পদ্মা ও তিস্তাসহ প্রায় সব বড় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আজ ব্যাহত। এই অবস্থায় শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক ফোরামে যাওয়ার প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে।

গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগও গুরুতর। চুক্তি অনুযায়ী জানুয়ারির শুরুতে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি পাওয়ার কথা থাকলেও নদীতে পানির প্রবাহ কম—এই অজুহাতে তা দেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ফারাক্কা ব্যারাজসহ গঙ্গা অববাহিকায় একাধিক ক্যানেলের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পানি সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। ভাগীরথী ও হুগলী নদীর নাব্য রক্ষার জন্য নির্মিত অবকাঠামোগুলো মূলত বাংলাদেশের প্রাপ্য পানিই প্রত্যাহারের পথ তৈরি করেছে।

পরিবেশবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের বেশি সময়েও পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় না হওয়া নতজানু পররাষ্ট্রনীতির ফল। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক পানি কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করে ভারতের পানি আগ্রাসনের বিষয়টি বিশ্বদরবারে তোলার সময় বহু আগেই এসেছে। ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প আন্তর্জাতিক নদী আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এর ফল ভোগ করছে বাংলাদেশ।

কুশিয়ারা নদী নিয়েও একই চিত্র। ২০২২ সালে চুক্তি স্বাক্ষরের পরও নানা অজুহাতে বাংলাদেশকে পানি তুলতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে।

পানি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের যে ক্ষতি হচ্ছে, তার আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন। ফারাক্কা চুক্তি কার্যকর থাকা অবস্থাতেই যখন পানি পাওয়া যাচ্ছে না, তখন চুক্তি শেষ হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারি পর্যায়েও বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানিয়েছেন, ভারত অন্যায়ভাবে পানি প্রত্যাহার করছে এবং এতে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদও বলেছেন, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ভারতকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে চাপ দিতে হবে।

সব মিলিয়ে অভিন্ন নদীর পানির প্রশ্ন এখন শুধু পরিবেশ বা কৃষির ইস্যু নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন এবং বৈশ্বিক ফোরামের সমন্বিত প্রয়াস ছাড়া বিকল্প পথ নেই—এমন মতই এখন ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত