কঙ্গোয় শান্তিরক্ষা মিশনে বিমান বাহিনীর নতুন কন্টিনজেন্ট প্রতিস্থাপন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ কঙ্গোয় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এভিয়েশন ট্রান্সপোর্ট ইউনিটের কন্টিনজেন্ট প্রতিস্থাপন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী ভূমিকার ধারাবাহিকতায় এই প্রতিস্থাপন কার্যক্রমকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে সুনাম অর্জন করেছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। কঙ্গোয় নতুন কন্টিনজেন্ট পাঠানোর মধ্য দিয়ে সেই অঙ্গীকার আরও একবার দৃঢ় হলো।

রোববার সকালেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ছিল ব্যস্ততা। শান্তিরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত মোট ৬২ জন সদস্যের মধ্যে প্রথম ধাপে ৩৫ জন শান্তিরক্ষী ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে কঙ্গোর উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। বাকি ২৭ জন সদস্য আগামী ২ ফেব্রুয়ারি একই গন্তব্যে রওনা হবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কন্টিনজেন্টের দায়িত্ব নতুন দল আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করবে।

নতুন কন্টিনজেন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ সেলিম জাভেদ। তিনি অভিজ্ঞ একজন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। এর আগেও তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছেন। কঙ্গোয় দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখা তাদের প্রধান লক্ষ্য। শান্তিরক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন এবং মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও তারা ভূমিকা রাখবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কন্টিনজেন্টের বিদায় উপলক্ষে বিমানবন্দরে এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে শান্তিরক্ষীদের নিরাপদ যাত্রা ও সফল দায়িত্ব পালনার্থে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। মোনাজাতে দেশ, জাতি এবং বিশ্বশান্তির জন্য দোয়া করা হয়। শান্তিরক্ষীরা যেন সুস্থভাবে দায়িত্ব সম্পন্ন করে দেশে ফিরতে পারেন, সেই প্রার্থনাও করা হয়।

এই বিদায় অনুষ্ঠানে বিমান বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা শান্তিরক্ষীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দায়িত্ব পালনের সময় শৃঙ্খলা, সততা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানান। কর্মকর্তারা বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের প্রতিটি সদস্য শুধু নিজের নয়, পুরো দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁদের আচরণ, কাজের মান এবং নৈতিক অবস্থান বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরে।

বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন শান্তিরক্ষীদের উদ্দেশে বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সদস্যরা সব সময় দক্ষতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি নতুন কন্টিনজেন্টের সদস্যদের প্রতি দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব প্রদর্শনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্থানীয় আইন, সংস্কৃতি ও জনগণের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক সহায়তার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। কঙ্গোয় বিমান বাহিনীর এভিয়েশন ট্রান্সপোর্ট ইউনিট মূলত জাতিসংঘ মিশনের লজিস্টিক সাপোর্ট, পরিবহন ব্যবস্থা এবং জরুরি প্রয়োজনে আকাশপথে সহায়তা প্রদান করে থাকে। দুর্গম এলাকায় শান্তিরক্ষীদের চলাচল এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পরিবহনে এই ইউনিটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কঙ্গোর পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই জটিল। দেশটিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবিক সংকট শান্তিরক্ষা মিশনের চ্যালেঞ্জ বাড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করলেও অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা দায়িত্ব পালনে সব সময় সাহসিকতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই কন্টিনজেন্ট প্রতিস্থাপন শুধু একটি নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়। এটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান এবং শান্তিরক্ষায় দেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ যেমন বৈদেশিক সম্পর্ক জোরদার করছে, তেমনি দেশের সশস্ত্র বাহিনীর পেশাগত দক্ষতাও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যাচাই হচ্ছে।

শান্তিরক্ষীদের পরিবার-পরিজনদের মাঝেও এই বিদায়ের সময় আবেগঘন মুহূর্ত দেখা গেছে। কেউ কেউ চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। আবার কারও চোখে ছিল গর্বের ঝিলিক। পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রিয়জনকে দূর দেশে ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বে পাঠানো সহজ নয়। তবুও দেশের সম্মান রক্ষায় তাঁরা গর্বিত।

আগামী কয়েক মাস কঙ্গোয় দায়িত্ব পালন শেষে এই কন্টিনজেন্ট দেশে ফিরবে। তার আগ পর্যন্ত শান্তিরক্ষার কঠিন বাস্তবতায় তাঁদের পেশাদারিত্বই হবে প্রধান শক্তি। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান যে শুধু সংখ্যায় নয়, মানেও গুরুত্বপূর্ণ— এই বার্তাই আবারও বহন করছে বিমান বাহিনীর এই নতুন কন্টিনজেন্ট।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত