ভোটের পরও ব্যবস্থা: ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বে কড়া ইসি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৯ বার
ভোট স্বচ্ছতায় কঠোর নির্বাচন কমিশন

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন কোনো ধরনের আপস করবে না বলে সাফ জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদ। ঋণখেলাপি হওয়া, দ্বৈত নাগরিকত্ব গোপন করা কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আড়াল করে কেউ যদি এবারের নির্বাচনে অংশ নিয়ে সাময়িকভাবে পারও পেয়ে যান, তবুও ভোটের পরে বিষয়টি প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দেন তিনি। নির্বাচন শুধু ভোটগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই কমিশনের মূল লক্ষ্য—এমন বার্তাই উঠে এসেছে তার বক্তব্যে।

সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীতে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনার এসব কথা বলেন। সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনী পরিবেশ এবং কমিশনের প্রস্তুতি নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার দায়িত্ব পালনে অটল রয়েছে। কোনো প্রার্থী বা রাজনৈতিক দলের জন্য ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। আইনের চোখে সবাই সমান এবং সেই নীতিতেই কমিশন কাজ করছে।

ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না—এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে ইসি মাছউদ বলেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ সন্তোষজনক রয়েছে। মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে এবং ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা কমিশনের নজরে আসেনি। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক কোনো চাপ অনুভব করছে না। কমিশনের ওপর কোনো পক্ষের প্রভাব নেই এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছে।

সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে একটি ভালো ভোট অনুষ্ঠিত হবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে নির্বাচন কমিশনার ভোটারদের নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, ভোটারদের অংশগ্রহণই একটি নির্বাচনের মূল শক্তি। জনগণ যত বেশি ভোট দিতে কেন্দ্রে যাবে, তত বেশি নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হবে। এজন্য কমিশন ভোটারদের নিরাপত্তা ও সুবিধা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে।

রাজনৈতিক দলের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের ওপর কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে না। বরং আগের তুলনায় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে সব দলের জন্য সমান সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণা, সভা-সমাবেশ কিংবা অন্যান্য কার্যক্রমে কাউকে বাড়তি সুবিধা বা অসুবিধার মুখে পড়তে হচ্ছে না—এ বিষয়টি নিশ্চিত করতেই কমিশন মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।

নির্বাচনে প্রার্থীদের যোগ্যতা ও আইনগত বিষয় নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইসি মাছউদ বলেন, ঋণখেলাপি কিংবা দ্বৈত নাগরিকত্বের মতো গুরুতর বিষয় গোপন করা সংবিধান ও নির্বাচন আইন অনুযায়ী অপরাধ। কেউ যদি তথ্য গোপন করে মনোনয়নপত্র দাখিল করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে ধরা না পড়ে নির্বাচনে অংশ নেয়, তবুও সেটিকে চূড়ান্ত বৈধতা দেওয়া হবে না। ভোটের পরেও যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শুধু ভোট আয়োজন করা নয়, বরং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যেন আইনি ও নৈতিকভাবে বৈধ হন, সেটিও নিশ্চিত করা।

জাতীয় পার্টিকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখার বিষয়ে চলমান আলোচনা প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার বলেন, জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ দলটির নিবন্ধন বৈধ ও বহাল রয়েছে। আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত যে কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার রাখে। নির্বাচন কমিশন কোনো দলকে রাজনৈতিক বিবেচনায় বাদ দিতে পারে না। এটি সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার বিষয় এবং কমিশন সেই আইন মেনেই কাজ করবে।

নির্বাচন কমিশনের এই অবস্থানকে বিশ্লেষকরা দেখছেন ভোটের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে। অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক, তথ্য গোপনের অভিযোগ এবং নির্বাচনের পর আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই কমিশন এবার আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলে মনে করছেন তারা। বিশেষ করে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের মতো বিষয়গুলো সরাসরি জনপ্রতিনিধিত্বের নৈতিকতার সঙ্গে জড়িত হওয়ায় কমিশনের কঠোর অবস্থান জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।

একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যে একটি স্পষ্ট বার্তা রয়েছে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য—নির্বাচনে অংশগ্রহণ মানেই শুধু ভোটের দিন পর্যন্ত দায়িত্ব শেষ নয়। নির্বাচনের আগে ও পরে প্রতিটি তথ্যের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। এই বার্তা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচনী পরিবেশ সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও ইসি মাছউদ বলেন, কমিশন আত্মতুষ্টিতে ভুগছে না। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোথাও অনিয়ম বা সহিংসতার আশঙ্কা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কমিশন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে চায়।

সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের এই কঠোর অবস্থান ভোটের পরেও জবাবদিহির একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিকত্ব বা অন্য কোনো তথ্য গোপন করে নির্বাচনে পার পাওয়ার সুযোগ নেই—এই বার্তা যদি বাস্তবে কার্যকর হয়, তাহলে ভবিষ্যতে নির্বাচনী রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা আরও জোরদার হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত