প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণপ্রত্যাশী বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা এসেছে। অভিবাসন ভিসা স্থগিতের পর এবার বাংলাদেশসহ নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের নাগরিকদের জন্য সর্বোচ্চ তিন মাস মেয়াদি, একবার প্রবেশযোগ্য বা সিঙ্গেল-এন্ট্রি নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস সোমবার এক তথ্যবার্তায় ‘ভিসা বন্ড’ পাইলট প্রোগ্রাম কীভাবে কার্যকর হবে, তার বিস্তারিত তুলে ধরে এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। নতুন এই উদ্যোগ ঘিরে বাংলাদেশে ভ্রমণপ্রত্যাশী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের মধ্যে উদ্বেগ ও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এর আগে গত ৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসন ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। একইসঙ্গে বাংলাদেশকে ‘ভিসা বন্ড’ পাইলট প্রোগ্রামের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মূলত যেসব দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও থেকে যাওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ মনে করে, সেই দেশগুলোকেই এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য হলো ভিসা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা এবং অবৈধ অবস্থান বা ওভারস্টে নিরুৎসাহিত করা।
মার্কিন দূতাবাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভিসা বন্ড পাইলট প্রোগ্রামের অধীনে আবেদনকারীদের ভিসা ইন্টারভিউয়ের পর যোগ্য বিবেচিত হলে কনসুলার কর্মকর্তা বন্ড পরিশোধের নির্দেশনা দেবেন। এই নির্দেশনার সঙ্গে থাকবে pay.gov–এর একটি সরাসরি লিংক, যার মাধ্যমে অনলাইনে বন্ড জমা দিতে হবে। ভিসা অনুমোদনের ৩০ দিনের মধ্যে এই বন্ড পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বন্ড জমা না দিলে ভিসা কার্যকর হবে না।
এই কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশি নাগরিকদের সর্বোচ্চ তিন মাসের জন্য একবার প্রবেশযোগ্য ভিসা দেওয়া হবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রে একবার প্রবেশের পর ভিসার মেয়াদ শেষ হলে বা দেশ ত্যাগ করলে সেই ভিসা আর ব্যবহার করা যাবে না। পুনরায় যেতে চাইলে নতুন করে ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। ভিসার এই সীমিত মেয়াদ এবং সিঙ্গেল-এন্ট্রি শর্ত অনেকের জন্য ভ্রমণ পরিকল্পনাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভিসা বন্ড কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো নির্ধারিত কিছু পোর্ট অব এন্ট্রি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা। মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই প্রোগ্রামের আওতায় ভিসাপ্রাপ্ত যাত্রীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে হবে নির্দিষ্ট তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে। সেগুলো হলো বোস্টন লোগান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এবং ওয়াশিংটন ডুলস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। নির্ধারিত এই পথের বাইরে অন্য কোনো বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশ বা প্রস্থান করলে বন্ডের শর্ত ভঙ্গ হয়েছে বলে গণ্য হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জমা দেওয়া অর্থ ফেরত পাওয়ায় জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ভিসা বন্ডের পরিমাণ নিয়েও বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নতুন এই নিয়মের আওতায় বাংলাদেশিদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত জামানত জমা দিতে হতে পারে। এই অর্থ ফেরতযোগ্য হলেও অনেকের জন্য এটি বড় অঙ্কের আর্থিক ঝুঁকি। মার্কিন কর্তৃপক্ষ বলছে, আবেদনকারীর ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে বন্ডের অঙ্ক নির্ধারণ করা হবে। অর্থাৎ, সবার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অঙ্ক প্রযোজ্য হবে না, তবে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সীমা হিসেবে ১৫ হাজার ডলারের কথা জানানো হয়েছে।
মার্কিন দূতাবাসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভিসার সব শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করলে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করে নিজ দেশে ফিরে এলে বন্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এরপর জমা দেওয়া অর্থ আবেদনকারীর কাছে ফেরত দেওয়া হবে। তবে শর্ত ভঙ্গের ক্ষেত্রে এই অর্থ বাজেয়াপ্ত হতে পারে। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ধরনের কাজ না করা, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দেশ ত্যাগ করা এবং নির্ধারিত পোর্ট অব এন্ট্রি ব্যবহার করা।
বিশ্লেষকদের মতে, ভিসা বন্ড মূলত একটি ফেরতযোগ্য আর্থিক জামানত ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ভিসার শর্ত মানা নিশ্চিত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার ক্ষেত্রে কেউ অনুমোদিত সময়ের বেশি অবস্থান করলে সেটিকে ভিসা ওভারস্টে হিসেবে গণ্য করা হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনে গুরুতর অপরাধ। নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভাব্য ওভারস্টে ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি আবেদনকারীদের ওপর একটি আর্থিক দায়বদ্ধতা তৈরি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ছাড়াও এই ভিসা বন্ড পাইলট প্রোগ্রামের আওতায় আরও কয়েকটি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তালিকায় রয়েছে আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, ভুটান, কিউবা, জিবুতি, ফিজি, নাইজেরিয়া, নেপাল ও উগান্ডা। দেশভেদে এই নিয়ম কার্যকর হওয়ার তারিখ ভিন্ন হতে পারে বলে জানিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। তবে মূল কাঠামো প্রায় একই থাকবে।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ বা স্বল্পমেয়াদি ব্যবসায়িক কাজে যেতে আগ্রহীদের জন্য ভিসা পাওয়া আরও ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করছেন, নিয়ম মেনে ভ্রমণকারীদের জন্য এটি বড় সমস্যা হবে না, বরং যারা অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার চিন্তা করেন, তাদের জন্যই এটি একটি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা বন্ড নীতি বাংলাদেশিদের জন্য ভ্রমণ ব্যবস্থায় একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। সীমিত মেয়াদের সিঙ্গেল-এন্ট্রি ভিসা, বড় অঙ্কের সম্ভাব্য জামানত এবং নির্দিষ্ট বিমানবন্দর ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা—সবকিছু মিলিয়ে এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ ও যোগাযোগের চিত্রে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের জন্য প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।