প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় নির্বাচনি জনসভায় চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও অনৈতিক আয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, সমাজে যারা চাঁদাবাজি ও দখলদারির মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদেরকেও সম্মানের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ করে দিতে চায় জামায়াতে ইসলামী। তবে কোনো অবস্থাতেই চাঁদাবাজি বা মানুষের কষ্টের বিনিময়ে উপার্জন মেনে নেওয়া হবে না।
সোমবার দুপুর পৌনে ১২টায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা তোমাদের হাতেও কাজ তুলে দিতে চাই। আমরা কোনো বেকার ভাতা দেব না। বেকার ভাতা দিয়ে আমরা বেকারের মহাসমুদ্র তৈরি করতে চাই না।” তিনি বলেন, যারা আজ চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত, তারা সমাজে অপমানজনকভাবে বসবাস করছে। মানুষ তাদের ঘৃণা করে, অভিশাপ দেয়। কিন্তু একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে উঠলে সেই মানুষগুলোই সম্মানের সঙ্গে সমাজে বসবাস করতে পারবে।
জামায়াত আমিরের বক্তব্যে মানবিক আহ্বানও উঠে আসে। তিনি বলেন, যদি কেউ সত্যিই সংসারের অভাব-অনটনের কারণে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে থাকেন, তবে তাদের সেই পথ ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তিনি। “আল্লাহ আমাদের যে রিজিক দিয়েছেন, সেই রিজিক আপনাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খেতে আমরা রাজি আছি। তবুও মানুষকে কষ্ট দেবেন না, চাঁদাবাজি করবেন না,”—এমন ভাষায় তিনি সমাজের প্রান্তিক ও বিপথগামী মানুষদের প্রতি সহানুভূতির বার্তা দেন।
ডা. শফিকুর রহমান কুষ্টিয়ার বাস্তব পরিস্থিতির উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, জেলায় প্রায় ৬০টির মতো অটো রাইস মিল ও চালকল রয়েছে। এখান থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক চাল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়। অথচ প্রতিটি ট্রাক থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করা হয়। তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেন, “চাঁদা বললে মানুষ লজ্জা পায়, তাই একে বেসরকারি খাজনা বলা হয়।” প্রতি ট্রাক থেকে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এর ফলে ট্রাক মালিক, ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকরা সবাই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন।
তিনি আরও বলেন, শুধু চালকল বা ট্রাক থেকে নয়, বিভিন্ন পরিবহন স্ট্যান্ড দখল নিয়েও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা হচ্ছে। যদিও তিনি নির্দিষ্ট কোনো স্ট্যান্ডের নাম উল্লেখ করেননি, তবুও তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে এই দখলবাজি ও চাঁদাবাজি স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে দিচ্ছে। জামায়াত আমির এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে হলে সবাইকে এই সংস্কৃতি পরিহার করতে হবে।
জামায়াতের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার কথা তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তাদের লক্ষ্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়া, যেখানে প্রত্যেক সক্ষম নারী ও পুরুষের হাতে মর্যাদার কাজ তুলে দেওয়া হবে। বিশেষ করে যুবক-যুবতীদের শক্তি ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্নের কথা বলেন তিনি। তার ভাষায়, “এই যৌবনের শক্তি দিয়ে তারা যেন দেশকে দারুণভাবে গড়তে পারে।”
এই জনসভা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল একটি বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া জনসভায় সভাপতিত্ব ও স্বাগত বক্তব্য দেন জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির এবং কুষ্টিয়া-২ আসনে ১১ দলীয় প্রার্থী আব্দুল গফুর। তিনি বক্তব্যে বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুশাসন নিশ্চিত করতেই ১১ দলীয় জোট নির্বাচনে মাঠে নেমেছে।
জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটির নায়েবে আমির অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, জাগপার কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিনিধি, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জেলা সভাপতি এবং এবি পার্টির জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদকসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। কুষ্টিয়ার চারটি আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীরাও তাদের বক্তব্যে জনগণের সমর্থন কামনা করেন।
বক্তারা তাদের বক্তব্যে বারবার দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তারা বলেন, এই সমস্যাগুলো শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের ফল। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এসব অনাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়।
জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি সুজা উদ্দিন জোয়ার্দ্দারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই জনসভায় আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী ৬০ থেকে ৭০ হাজার মানুষের উপস্থিতি ছিল। জনসমুদ্রের মতো ভিড়ের মধ্যে ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে বারবার করতালি ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম এলাকা। এতে স্পষ্ট হয়, নির্বাচনের প্রাক্কালে জামায়াত ও তার মিত্র দলগুলো কুষ্টিয়ায় শক্ত অবস্থান জানান দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত আমিরের এই বক্তব্য নির্বাচনি কৌশলের পাশাপাশি একটি সামাজিক বার্তাও বহন করছে। একদিকে তিনি চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন, অন্যদিকে সেই মানুষগুলোকেও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এতে একটি মানবিক ও নৈতিক রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায়, যা নির্বাচনি রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, কুষ্টিয়ার এই জনসভা জামায়াতের নির্বাচনি প্রচারণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে ঘোষিত অবস্থান কতটা বাস্তবায়নযোগ্য হবে, তা সময়ই বলবে। তবে এই বক্তব্য ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।