প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর ঢাকা-১৮ আসনে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে সহিংসতার অভিযোগ নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি করেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মো. আরিফুল ইসলামের ওপর অতর্কিত হামলার অভিযোগ উঠেছে। দলটির দাবি, সোমবার সকালে খিলক্ষেতের ডুমনি বাজার এলাকার নূরপাড়া এতিমখানা পরিদর্শন ও গণসংযোগ কর্মসূচিতে অংশ নিতে গেলে তার ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। এই ঘটনায় এনসিপি ও জামায়াত আলাদাভাবে নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও নির্বাচনী পরিবেশ নিরাপদ করার দাবি জানিয়েছে।
এনসিপির ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আরিফুল ইসলাম ডুমনি এলাকায় পৌঁছালে বিএনপির স্থানীয় নেতা দিদার মোল্লার নেতৃত্বে একদল লোক তার ওপর হামলা চালায়। হামলায় তিনি ও তার সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীরা আতঙ্কের মুখে পড়েন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আরিফুল ইসলাম বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা তার ওপর আক্রমণ চালিয়েছে এবং তার সহযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। তিনি এই ঘটনাকে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক সহিংসতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
হামলার ঘটনার পর এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন বলেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তার দাবি, আগের দিনও একই এলাকায় এনসিপির নেতাকর্মীদের হেনস্তা করা হয়েছিল। সে সময় বিএনপি প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি পুনরাবৃত্তি হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরদিনই আবার হামলার ঘটনা ঘটায় এনসিপি নেতারা গভীর হতাশা প্রকাশ করেন এবং নির্বাচনী মাঠে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানান।
এনসিপির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, শুধু ডুমনি এলাকাতেই নয়, ঢাকা-১৮ আসনের বিভিন্ন স্থানে তাদের প্রচারণায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। আবদুল্লাহপুর এলাকায় প্রচারণাকালে এক জামায়াত কর্মীর মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। খিলক্ষেতের বরুয়া এলাকায় নির্বাচনী অফিস উদ্বোধনের সময় মব সৃষ্টি করে বাধা দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি তুরাগ ও নিকুঞ্জ এলাকায় নারী কর্মীদের প্রচারণায় বাধা ও হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ এনসিপির।
দুপুরে উত্তরার বিএনএস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আরিফুল ইসলাম আদিব নিজের ও দলের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশ্যে শঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গণসংযোগ ও সামাজিক কার্যক্রমের মতো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও যদি হামলার শিকার হতে হয়, তাহলে নির্বাচন কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু হবে, সে প্রশ্ন উঠে আসে। তিনি অভিযোগ করেন, ডুমনি এলাকায় হামলার ঘটনায় বিএনপির ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি দিদার মোল্লার নেতৃত্বে একটি দল জড়িত ছিল। তিনি আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন, যাদের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এই ঘটনার পরপরই এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামী আলাদা বিবৃতিতে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচনের সময় সহিংসতা ও ভয়ভীতি সৃষ্টি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয় এবং হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি তোলা হয়।
অন্যদিকে, বিএনপি প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, আরিফুল ইসলামের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তিনি জানান, ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত হিসেবে যাদের নাম এসেছে, তাদের ডাকা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি। তার বক্তব্যে তিনি সহিংসতার অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা উল্লেখ করেন এবং নির্বাচনকালীন শান্তি বজায় রাখার অঙ্গীকার করেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মামলা বা লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি। খিলক্ষেত থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাজু আহমেদ বলেন, ঘটনার বিষয়ে এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তবে স্থানীয়ভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় এ ধরনের সহিংসতার অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ বাড়ায় এবং ভোটারদের আস্থায় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে একটি আসনে একাধিক দলের প্রার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে তা বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবেশকেও অস্থিতিশীল করতে পারে। তারা বলছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা-১৮ আসনটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখানে প্রচারণা ও জনসংযোগ কার্যক্রম বেশ জোরালোভাবে চলছে। বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিতে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে সহিংসতার অভিযোগ সামনে আসায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেকেই চাইছেন, রাজনৈতিক দলগুলো যেন সংযম দেখায় এবং শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনী কার্যক্রম চালায়।
এনসিপি নেতারা বলছেন, তারা শান্তিপূর্ণ রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন এবং জনগণের কাছে পৌঁছাতে গণসংযোগ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। কিন্তু একের পর এক বাধা ও হামলার অভিযোগ তাদের সেই প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে। একই সঙ্গে তারা নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিরাপত্তা জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, ঢাকা-১৮ আসনে এনসিপি প্রার্থীর ওপর হামলার অভিযোগ নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে। অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ রাখা গেলে তবেই ভোটারদের আস্থা বজায় থাকবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।