প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে নড়াইল সদর ও লোহাগড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ছয় নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এই বহিষ্কারাদেশ স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় বিএনপির কঠোর অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
বহিষ্কৃত নেতারা হলেন নড়াইল সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মুজাহিদুল ইসলাম পলাশ, নড়াইল সদর পৌর বিএনপির সভাপতি মো. তেলায়েত হোসেন, লোহাগড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আহাদুজ্জামান বাটু ও সাধারণ সম্পাদক কাজী সুলতানুজ্জামান সেলিম এবং লোহাগড়া পৌর বিএনপির সভাপতি মিলু শরীফ ও সাধারণ সম্পাদক মো. মশিয়ার রহমান সান্টু। নড়াইল জেলা বিএনপির রাজনীতিতে এঁরা সবাই দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এই বহিষ্কারের পেছনে রয়েছে নড়াইল-২ সংসদীয় আসনের প্রার্থী মনোনয়ন ঘিরে সৃষ্ট বিরোধ। গত ৪ ডিসেম্বর বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নড়াইল-২ আসনে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুল ইসলামের নাম দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন। ওই ঘোষণার পর স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায় এবং নির্বাচনী প্রস্তুতিও শুরু হয়।
তবে ঘোষণার প্রায় ২০ দিন পর, ২৪ ডিসেম্বর হঠাৎ করেই মনিরুল ইসলামের দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাহার করে বিএনপির শরীক দল নেতা এ জেড এম ফরিদুজ্জামান ফরহাদকে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। এই সিদ্ধান্তে নড়াইল জেলা ও লোহাগড়া অঞ্চলের একাংশের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হন। তাঁরা মনিরুল ইসলামের মনোনয়ন পুনর্বহালের দাবিতে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন।
দলীয় মনোনয়ন হারানোর পর মনিরুল ইসলাম নড়াইল-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন এবং যাচাই-বাছাই শেষে নড়াইলের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ২১ জানুয়ারি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি কলস প্রতীক বরাদ্দ পান। ওই দিনই দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করার অভিযোগে বিএনপি তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে।
মনিরুল ইসলামের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া এবং তার পক্ষে স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সমর্থনই পরবর্তীতে এই ছয় নেতার বহিষ্কারের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মতে, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়া কিংবা সংগঠনবিরোধী কার্যক্রম দলীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থী।
বহিষ্কারাদেশ প্রকাশের পর লোহাগড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহাদুজ্জামান বাটু সময় সংবাদকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বলেন, দলের প্রতি তাদের সম্মান ও ভালোবাসা সবসময় থাকবে। তিনি দাবি করেন, মনিরুল ইসলামকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার পর সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ মনোনয়ন প্রত্যাহার করে ফরিদুজ্জামান ফরহাদকে প্রার্থী করায় তারা ক্ষুব্ধ হন এবং ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতার মনোনয়ন পুনর্বহালের দাবিতে মানববন্ধন করেন।
তিনি আরও বলেন, প্রতীক বরাদ্দের পর তারা ধানের শীষের বিপক্ষে কোনো মিছিল, সভা বা প্রচারণায় অংশ নেননি। তাঁর অভিযোগ, নড়াইল-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোনো সাংগঠনিক যোগাযোগ রাখেননি এবং ঢাকায় গিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বিভ্রান্ত করে একটি কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্রে জেলার গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বহিষ্কার করিয়েছেন। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত বলেন, দল যে সিদ্ধান্তই নিক, তা তারা মাথা পেতে নেবেন।
নড়াইলের স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে এই বহিষ্কারাদেশ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একাংশ মনে করছেন, নির্বাচনের সময় দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এমন কঠোর পদক্ষেপ অনিবার্য। অন্যদিকে, আরেক অংশের মতে, হঠাৎ প্রার্থী পরিবর্তন ও স্থানীয় নেতাদের মতামত উপেক্ষা করাই এই সংকটের মূল কারণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বিএনপি এখন কোনো ধরনের বিভক্তি বা দ্বিধা রাখতে চায় না। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থিতা কিংবা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তা দিতেই এই বহিষ্কার। এতে মাঠপর্যায়ে দলীয় শৃঙ্খলা আরও দৃঢ় হতে পারে, তবে একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ ও মনোবল ভাঙার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, দীর্ঘদিন রাজনীতি করা নেতাদের বহিষ্কার ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে তাদের জন্য কঠিন বাস্তবতা তৈরি করে। অনেক নেতাই রাজনৈতিক জীবনের বড় সময় কাটিয়েছেন সংগঠনের জন্য কাজ করে। হঠাৎ বহিষ্কার তাদের সামাজিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, নড়াইলে বিএনপির ছয় নেতার বহিষ্কার কেবল একটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি আসন্ন নির্বাচনের আগে দলীয় নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে এবং নড়াইল-২ আসনের নির্বাচনী সমীকরণে এর কী প্রতিফলন ঘটবে—সেদিকে এখন তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।