দ্বৈত নাগরিকত্ব বিতর্কে রংপুর-১ আসনে প্রার্থিতা হারালেন মঞ্জুম আলী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২০ বার
রংপুর-১ আসনে মঞ্জুম আলীর প্রার্থিতা

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আইনি জটিলতায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-১ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলীর মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে বহাল রেখেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ মঙ্গলবার হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ বহাল রাখায় ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলীর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সব পথ বন্ধ হয়ে গেল। এই রায়ের ফলে রংপুর-১ আসনের নির্বাচনী সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

আদালতে ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলীর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম, মোহাম্মদ হোসেন লিপু, সৈয়দ মামুন মাহবুব ও ব্যারিস্টার শামিম হায়দার পাটোয়ারী। অপরদিকে, রংপুর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল। দীর্ঘ শুনানি শেষে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন, যার ফলে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া বৈধতার সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে যায়।

রায়ের পর ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল সাংবাদিকদের বলেন, গত ২১ জানুয়ারি হাইকোর্ট রংপুর-১ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলীর মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন। আজ আপিল বিভাগ সেই রায় বহাল রেখেছেন। এর মাধ্যমে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয়ে সংবিধান ও নির্বাচনী আইনের ব্যত্যয় ঘটলে কোনো প্রার্থীর অংশগ্রহণ বৈধ হতে পারে না।

এই মামলার পটভূমি বেশ জটিল ও দীর্ঘ। গত ১৭ জানুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-১ আসনে ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এর আগে যাচাই-বাছাইয়ের সময় তার মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও কমিশনে আপিলের পর তা বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়। তবে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রংপুর-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী মোকাররম হোসেন সুজন হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। সেই রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত বাতিল করে মঞ্জুম আলীর মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করেন।

আইনি সূত্রে জানা যায়, ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলীর মনোনয়নপত্র ঘিরে মূল আপত্তির বিষয় ছিল তার হলফনামায় দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তথ্য। গত ১ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই কার্যক্রমে রংপুর জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক এনামুল আহসান এই ইস্যুতে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। পরে তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন এবং একাধিক দফা শুনানি শেষে কমিশন তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে। কিন্তু বিষয়টি আদালতে গড়ালে ভিন্ন বাস্তবতা সামনে আসে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা অবস্থায় কেউ জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়ার যোগ্য নন, যদি না নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অন্য দেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের প্রমাণ দেওয়া হয়। আদালত তার রায়ে মূলত এই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিয়েছে। আপিল বিভাগের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

রাজনৈতিকভাবে রংপুর-১ আসন দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। এই আসনে জাতীয় পার্টির শক্তিশালী অবস্থান থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে নানা জটিলতা ও প্রার্থী পরিবর্তনের কারণে ভোটের সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে। ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলী জাতীয় পার্টির একজন পরিচিত মুখ এবং আইনজীবী হিসেবে তার একটি গ্রহণযোগ্যতা ছিল। তার প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় জাতীয় পার্টি এই আসনে বড় ধাক্কা খেল বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

এদিকে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। একাধিক দফা যাচাই-বাছাই ও আপিলের পর কমিশন যখন মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছিল, তখন আদালতের রায়ে সেটি বাতিল হওয়ায় কমিশনের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা আইন অনুযায়ী প্রাপ্ত কাগজপত্র ও উপস্থাপিত তথ্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

রংপুর-১ আসনে বর্তমানে যেসব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ রয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির মোকাররম হোসেন সুজন, জামায়াতে ইসলামীর রায়হান সিরাজী, ইসলামী আন্দোলনের এটিএম গোলাম মোস্তফা, এনসিপির আল মামুন, গণঅধিকার পরিষদের হানিফুর রহমান, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)-এর আহসানুল আরেফিন, ইসলামিক ফ্রন্টের মো. আনাস এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. মমিনুর রহমান। জাতীয় পার্টির প্রার্থী বাদ পড়ায় এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই রায় ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলীর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনে বড় একটি ধাক্কা। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, প্রচারণার পরিকল্পনা এবং সমর্থকদের প্রত্যাশা মুহূর্তেই ভেঙে পড়েছে। তার সমর্থকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশা প্রকাশ করছেন এবং কেউ কেউ একে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সিদ্ধান্ত বলেও মন্তব্য করছেন। তবে আদালতের রায় নিয়ে প্রকাশ্যে বিরূপ মন্তব্য না করে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী মোকাররম হোসেন সুজনের সমর্থকেরা এই রায়কে আইনের বিজয় হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত এবং আদালত সেই নীতিই প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা এই রায়ের পর নতুন উদ্যমে প্রচারণা জোরদার করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, রংপুর-১ আসনে এই রায়ের প্রভাব শুধু একটি আসনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে যেসব প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও নতুন করে আইনি চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, আপিল বিভাগের এই রায় নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আইনের শাসনের গুরুত্ব আবারও সামনে এনেছে। রংপুর-১ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীতা বাতিলের ঘটনায় নির্বাচনী মাঠে যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা আগামী দিনের ভোটের রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে—সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত