প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতি নেওয়া এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি ক্রীড়া ইস্যু নয়, বরং দেশের মর্যাদা, খেলোয়াড়দের সম্মান এবং জাতীয় আত্মমর্যাদার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সময় থাকতে আইসিসির উচিত তাদের সিদ্ধান্ত নতুন করে পর্যালোচনা করা এবং ন্যায়সঙ্গত অবস্থান গ্রহণ করা।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুরে সাতক্ষীরায় অনুষ্ঠিত ১১ দলের নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জামায়াত আমির এ আহ্বান জানান। মাঠভরা মানুষের সামনে দেওয়া তার বক্তব্যে ক্রিকেট, জাতীয় স্বার্থ, প্রতিবেশী সম্পর্ক এবং সামাজিক মূল্যবোধ একসঙ্গে উঠে আসে। বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বাংলাদেশের ক্রিকেট শুধু খেলাধুলার বিষয় নয়, এটি দেশের ভাবমূর্তি ও গর্বের প্রতীক।
ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে জাতীয় দলের অন্যতম তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, “একটা ছেলের কারণে আজ সাতক্ষীরাবাসী গর্বিত। ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশকে আলোকিত করেছে মোস্তাফিজুর রহমান। কিন্তু এই ছেলেকে পার্শ্ববর্তী দেশের একটি প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে যেতে দেওয়া হয়নি। এটা শুধু একজন খেলোয়াড়ের প্রতি নয়, পুরো দেশ ও বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতি চরম অপমান।” তার বক্তব্যে মাঠে উপস্থিত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ভারত গিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল এবং শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের দাবি তুলেছিল। কিন্তু সেই দাবির পরিণতিতে আইসিসি পুরো দলকেই প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেয়, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ডা. শফিকুর রহমানের ভাষায়, “এখনো সময় রয়েছে। আপনারা আপনাদের সিদ্ধান্ত রিভিউ করেন। এর আগেও বহু দল এমন আবেদন করেছিল এবং তা মেনেও নেওয়া হয়েছিল। যদি অন্যদের জন্য করা হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য কেন করা হবে না?”
তার বক্তব্যে আইসিসির নীতিগত নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে শক্তিশালী দেশগুলোর প্রভাব অনেক সময় সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়, যা অপেক্ষাকৃত ছোট বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৈষম্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে, সেখানে এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের ক্রিকেটের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের স্বার্থ সবার আগে রাখার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বাংলাদেশ সবসময়ই চায়। “আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের বন্ধু হিসেবে রাখতে চাই। তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে চাই। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা তাদের কাছ থেকেও উত্তম আচরণ প্রত্যাশা করি। আমরা বন্ধু হিসেবে থাকতে চাই, কিন্তু আল্লাহ ছাড়া কাউকে আমরা প্রভু হিসেবে আসতে দেব না।” তার এই বক্তব্যে জাতীয় আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌম অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
ক্রিকেট প্রসঙ্গের পাশাপাশি ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে সামাজিক ও মানবিক বিভিন্ন বিষয়ও তুলে ধরেন। নারীদের মর্যাদা নিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক নারীকে মায়ের সম্মান দেওয়া উচিত। তার ভাষায়, “যে বাচ্চাটার বয়স এক বছর, সেও আমার মা। সে বড় হলে একদিন সেও কোনো সন্তানের মা হবে।” সমাজে নারীদের প্রতি সম্মান, নিরাপত্তা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা ছাড়া একটি সভ্য ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
যুবসমাজের প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, দেশের তরুণদের হাতে বেকারত্বের তকমা তুলে দেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, “যুবকরা সম্মানের সঙ্গে লড়াই করে নিজেদের পথ খুঁজে নিতে চায়। তাদের যখন উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তখনই তাদের হাতে আমরা মর্যাদাপূর্ণ কাজ তুলে দিতে পারব।” তার মতে, যুবসমাজকে শক্তিশালী না করলে দেশের ভবিষ্যৎও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াবে না।
ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্নের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই দেশ কীভাবে মাথা উঁচু করে বিশ্বের দরবারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করবে, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করাই তাদের দায়িত্ব। ন্যায়বিচার, ইনসাফ ও দ্বীনি নির্দেশনার আলোকে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এ দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক দল বা নেতাদের নয়, বরং পুরো জাতির।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত আমিরের এই বক্তব্যে ক্রিকেট ইস্যু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। আইসিসির সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের বিভিন্ন মহলে আগেই অসন্তোষ ছিল, কিন্তু একটি বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার প্রকাশ্য আহ্বান বিষয়টিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় এনেছে। বিশেষ করে মোস্তাফিজুর রহমানের মতো জনপ্রিয় ও সফল ক্রিকেটারের প্রসঙ্গ টেনে আনার ফলে সাধারণ মানুষের আবেগের সঙ্গেও এটি যুক্ত হয়েছে।
ক্রিকেটপ্রেমী ও ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান এখন আগের চেয়ে অনেক শক্ত। এই সময়ে নেওয়া যেকোনো কঠোর বা একতরফা সিদ্ধান্ত দেশের ক্রিকেটের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তারা মনে করেন, আইসিসির উচিত সব সদস্য দেশের সঙ্গে সমান আচরণ নিশ্চিত করা এবং যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
সামগ্রিকভাবে, সাতক্ষীরার সমাবেশে দেওয়া ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এতে ক্রিকেট, জাতীয় মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বোধ এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা একসূত্রে মিলেছে। এখন দেখার বিষয়, আইসিসি এই আহ্বানের পর তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে কি না এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ পথচলায় এর কী প্রভাব পড়ে।