প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আগামী দিনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়, তবে দেশ ও জনগণের কল্যাণে দুইটি মৌলিক বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতিকে নির্মূল করাই হবে সম্ভাব্য জামায়াত সরকারের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য—এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুরে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে জেলা জামায়াতের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির। মাঠজুড়ে হাজারো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে সুশাসন, ইনসাফ, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং জনগণের ক্ষমতায়নের নানা প্রতিশ্রুতি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা আপনাদের কথা দিচ্ছি—আল্লাহ যদি আমাদের দেশ সেবার সুযোগ দেন, তাহলে প্রথমে দুটো কাজ করা হবে। চাঁদাবাজদের হাত শক্ত করে ধরবো, এরপর সব ধরনের সিন্ডিকেট ভেঙে চুরমার করে দেব। কোনো সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব বাংলাদেশে থাকতে দেওয়া হবে না।” তাঁর এই বক্তব্যে জনসভাস্থলে উপস্থিত সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে।
তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনকে জিম্মি করে রেখেছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজির মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের হয়রানি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার—এসবের মাধ্যমে তারা নিজেদের ‘জনসেবক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। জামায়াত ক্ষমতায় এলে এই ধারার অবসান ঘটানো হবে বলে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দেন।
সাতক্ষীরার প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিক বলেন, অতীতে এই জেলার সঙ্গে সৎ মায়ের সন্তানের মতো আচরণ করা হয়েছে। উন্নয়ন ও ন্যায্য সুযোগ থেকে সাতক্ষীরাবাসী দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “আপনারা যদি সাতক্ষীরার চারটি আসন আমাদের উপহার দেন, তাহলে ন্যায়, ইনসাফ, জনগণের সরকার এবং মদিনার শাসনামলের আদলে সুশাসন কায়েমের জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। এই ঋণ শোধ করতে আমরা আমাদের পুরো সময় ব্যয় করবো।”
জনগণের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করা হবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ওপর থেকে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হবে না। তিনি আশ্বাস দেন, আল্লাহ যদি জনগণের ভোটে জামায়াতকে সরকার গঠনের সুযোগ দেন, তবে কোনো শিক্ষিত চোর বা দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠী জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করতে পারবে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “এই দুঃখী বাংলাদেশের সম্পদ লুট করে কিছু মানুষ আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। তারা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে জনগণের সেবক সেজেছে, অথচ দেশের টাকা বিদেশে পাচার করেছে।” এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, “আমরা জামায়াত ইসলামের বিজয় চাই না, আমরা চাই ১৮ কোটি মানুষের বিজয়। ১৮ কোটি মানুষের মুক্তিই আমাদের মুক্তি। তাই ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম সিলটি পড়বে হ্যাঁ ভোটে। হ্যাঁ মানে আজাদি, না মানে গোলামি। আপনারাই সিদ্ধান্ত নিন—গোলামি না আজাদি।” তাঁর এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জামায়াত আমির জানান, সুযোগ পেলে দেশ পরিচালিত হবে দীনের নির্দেশনার আলোকে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, মুসলমানদের মধ্যেও বিভিন্ন মত ও পথ রয়েছে। তাই সবার মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে একটি কমন বোর্ড গঠন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাঁর মতে, এই পদ্ধতিই প্রকৃত ইনসাফ ও ঐক্যের পথ দেখাতে পারে।
রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রসঙ্গে ডা. শফিক বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে সম্মানের সঙ্গে বাঁচার পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিতদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা হবে। তিনি বলেন, “একই বেতন কাঠামোতে ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করানো চরম বেইনসাফি। ইনসাফ মানে সবাইকে সমান দেওয়া নয়, ইনসাফ মানে প্রত্যেককে তার ন্যায্য পাওনা দেওয়া।”
যুব সমাজ নিয়ে আলাদা করে কথা বলেন জামায়াত আমির। তিনি জানান, যুবকদের হাতে বেকার ভাতা তুলে দেওয়া তাঁর দল সমর্থন করে না। তাঁর মতে, বেকার ভাতা যুবকদের অপমানের শামিল। বরং তাদের উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, “আমরা যুবকদের হাতে মর্যাদার কাজ তুলে দেব। তখন তারা গর্ব করে বলবে—আমরা এই দেশের গর্বিত নাগরিক।”
প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে ডা. শফিক বলেন, বাংলাদেশ তার প্রতিবেশীদের বন্ধু হিসেবে দেখতে চায়, প্রভু হিসেবে নয়। তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কিছু সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান এবং বলেন, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমির উপাধ্যক্ষ শহিদুল ইসলাম মুকুল এবং সঞ্চালনা করেন জেলা সেক্রেটারি আজিজুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। এছাড়া সাতক্ষীরার চারটি আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থীসহ ছাত্রশিবির ও ১০ দলীয় জোটের নেতারাও বক্তব্য দেন।
সব মিলিয়ে, সাতক্ষীরার এই জনসভায় জামায়াত আমিরের বক্তব্য শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল রাষ্ট্র পরিচালনা, সুশাসন, ন্যায়বিচার ও যুব সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।