ফ্যাসিবাদী রাজনীতি থেকে মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জামায়াত আমিরের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৬ বার
ফ্যাসিবাদী রাজনীতি থেকে মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জামায়াত আমিরের

প্রকাশ: ২৮  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে যে দোষারোপ, হিংসা ও কর্তৃত্ববাদী চর্চা চলে আসছে, সেখান থেকে দেশকে বের করে আনার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ধোঁকা–মিথ্যাবাদী ও ফ্যাসিবাদী কায়দার রাজনীতি জাতিকে বিভক্ত করেছে, মানুষের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে রাজনীতির ভাষা, চরিত্র ও উদ্দেশ্যের মৌলিক পরিবর্তন জরুরি।

মঙ্গলবার রাত পৌনে ১০টার দিকে গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলা সদরের কলেজ মোড় বাসস্ট্যান্ডে অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনী পথসভায় এসব কথা বলেন জামায়াতের আমির। পথসভাটি ঘিরে পুরো এলাকায় ব্যাপক উৎসাহ ও উত্তেজনা লক্ষ্য করা যায়। সন্ধ্যা থেকেই মুকসুদপুর কলেজ মোড় ও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় জামায়াতের নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে জড়ো হতে থাকেন। স্লোগান, ব্যানার ও মিছিলের পদচারণায় এলাকাটি মুখরিত হয়ে ওঠে। জামায়াত আমিরের আগমনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে।

ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে। রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মামলা ও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে দলটি সময় পার করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সেই সময়ের কষ্ট ও বঞ্চনার প্রতিশোধ নেওয়ার রাজনীতি জামায়াত করে না। বরং ৫ আগস্টের পর তারা সব ধর্ম, শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের আশ্বস্ত করেছেন এবং সাহস জুগিয়েছেন। তার ভাষায়, এই দেশ কারও একার নয়—এ দেশে সবাই সমান, সবার অধিকারও সমান।

বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রত্যয় ব্যক্ত করে জামায়াত আমির বলেন, আগামীর প্রজন্মের জন্য একটি হিংসামুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও ঐক্যের বাংলাদেশ গড়াই তাদের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, দেশে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে কেউ অন্যায়ের শিকার হবে না, যেখানে জালিমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র নিজেই প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। তার কথায়, “জালিমকে কারও দিকে হাত বাড়াতে দেবো না।” এই বক্তব্যে উপস্থিত জনতার মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে।

ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, ধোঁকাবাজি, ব্যাংক ডাকাতি কিংবা শেয়ারবাজার লুটপাটের রাজনীতি জামায়াতে ইসলামী কখনোই করতে চায় না। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে এসব অনৈতিক চর্চার কারণে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সাধারণ মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছে এবং আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। জামায়াতের রাজনীতির লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তাদের রাজনীতি দেশের মালিক হওয়ার জন্য নয়, বরং দেশের সেবক হওয়ার জন্য। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি ক্ষমতা নয়, সেবাকে রাজনীতির মূল দর্শন হিসেবে তুলে ধরেন।

পথসভায় বক্তব্যের এক পর্যায়ে গোপালগঞ্জ-১ আসনের প্রেক্ষাপট উঠে আসে। এই আসনে মুকসুদপুর ও কাশিয়ানীর একাংশ অন্তর্ভুক্ত। সেখানে ১১ দলীয় জোট মনোনীত জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মাওলানা মো. আব্দুল হামিদকে জনসমক্ষে পরিচয় করিয়ে দেন জামায়াত আমির। প্রার্থীর হাত উঁচু করে ধরে তিনি জনতার উদ্দেশে বলেন, “আমি এই তার হাতটি উঁচু করে ধরলাম—আপনারাও তার জন্য লড়বেন।” এই আহ্বানে উপস্থিত সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়।

ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে অতীতের রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিরোধ প্রসঙ্গেও কথা বলেন। তিনি জানান, অতীতে তাদের সঙ্গে যা যা অন্যায় হয়েছে, দলীয়ভাবে সেসব তারা ক্ষমা করে দিয়েছেন। তার মতে, প্রতিশোধের রাজনীতি সমাজে নতুন করে বিভাজন তৈরি করে, আর ক্ষমা ও সংযম ভবিষ্যতের পথকে সহজ করে। তিনি বলেন, জামায়াত তাদের কথা রেখেছে এবং আগামীতেও নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসবে না।

পথসভায় উপস্থিত সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই দীর্ঘদিন পর এমন সরাসরি রাজনৈতিক সমাবেশে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত। কেউ কেউ বলেন, তারা এমন রাজনীতি দেখতে চান যেখানে ভয়ের পরিবেশ থাকবে না, মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে। আবার কেউ কেউ জামায়াতের বক্তব্যকে পরিবর্তনের বার্তা হিসেবে দেখছেন, যদিও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসব প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হবে—সে প্রশ্নও করছেন অনেকে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডা. শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য কেবল একটি নির্বাচনী ভাষণ নয়, বরং চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াতের অবস্থান স্পষ্ট করার একটি প্রচেষ্টা। ফ্যাসিবাদী কায়দার রাজনীতির সমালোচনার মধ্য দিয়ে তিনি সরাসরি কর্তৃত্ববাদ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। একই সঙ্গে সব ধর্ম ও শ্রেণির মানুষের সমান অধিকারের কথা তুলে ধরে তিনি দলটির অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছেন।

গোপালগঞ্জের মতো একটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকায় এমন পথসভা আয়োজন এবং সেখানে বড় সমাবেশ হওয়াকে অনেকে জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। সামনে জাতীয় রাজনীতিতে এই বক্তব্য ও কার্যক্রম কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটুকু স্পষ্ট, ফ্যাসিবাদী রাজনীতি থেকে মুক্তি, হিংসামুক্ত সমাজ এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার যে বার্তা ডা. শফিকুর রহমান দিয়েছেন, তা বর্তমান রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

সব মিলিয়ে, মুকসুদপুরের এই পথসভা শুধু একটি নির্বাচনী কর্মসূচি ছিল না, বরং জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক দর্শন, অতীত অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি সমন্বিত প্রকাশ। ক্ষমতার লড়াইয়ের চেয়ে নৈতিকতা ও সেবার রাজনীতির যে দাবি তিনি তুলেছেন, তা দেশের রাজনীতিতে কতটা বাস্তব রূপ পায়—সেদিকেই এখন নজর থাকবে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত