প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশে সংযম, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী মির্জা আব্বাস। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বিএনপি কখনোই প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিবাদে যাবে না। দলের বিজয় এখন দ্বারপ্রান্তে, আর এই বিজয় যেন কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া থেকে সবাইকে বিরত থাকার নির্দেশনাও দেন তিনি।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর মতিঝিলের ব্রাদার্স ক্লাব মাঠে আয়োজিত এক গণজমায়েতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা আব্বাস এসব কথা বলেন। মাঠজুড়ে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থকের উপস্থিতিতে তিনি নির্বাচনকালীন রাজনীতি, প্রতিপক্ষের আচরণ এবং বিএনপির করণীয় নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন। তাঁর বক্তব্যে বারবারই উঠে আসে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক চর্চা ও জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়টি।
মির্জা আব্বাস বলেন, বিএনপি একটি পরীক্ষিত রাজনৈতিক দল। এই দল গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও জনগণের শক্তিতে বিশ্বাস করে। তাই কোনো ধরনের সংঘাত, বিশৃঙ্খলা বা অপ্রয়োজনীয় বিবাদে জড়ানো বিএনপির রাজনৈতিক চরিত্রের সঙ্গে মানানসই নয়। তিনি বলেন, “বিজয় আমাদের দ্বারপ্রান্তে। এই বিজয় যেন কেউ রুখে দিতে না পারে, সেই দিকে সবাইকে লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রতিপক্ষের উস্কানিতে পা দিলে তারাই লাভবান হবে, বিএনপি নয়।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, একটি অসাধু চক্র পরিকল্পিতভাবে দেশকে আবারও পরাধীনতার দিকে ঠেলে দিতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য হলো জনগণের ভোটাধিকার নষ্ট করা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। মির্জা আব্বাসের ভাষায়, “তারা বাংলাদেশকে গোলাম বানিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু জনগণ সচেতন। ১২ তারিখে ভোটের মাধ্যমে জনগণই এর উপযুক্ত জবাব দেবে।” তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, গণরায়ের সামনে কোনো অপশক্তিই টিকতে পারবে না।
বিএনপির শক্ত অবস্থানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিএনপির সামনে কোনো দল টিকে থাকতে পারবে না—এই শিক্ষা সবাইকে নিতে হবে।” তবে সেই সঙ্গে তিনি নেতাকর্মীদের স্মরণ করিয়ে দেন, শক্তি প্রদর্শনের নামে কোনো ধরনের অশৃঙ্খলা বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মতে, বিএনপির কর্মীরা কখনোই অশৃঙ্খল নয় এবং ভবিষ্যতেও হবে না। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আচরণই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি।
গণজমায়েতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মির্জা আব্বাস অভিযোগ করেন, বিএনপিকে কালিমালিপ্ত করতে একটি মহল দীর্ঘদিন ধরেই পরিকল্পিত অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচনী মাঠে বিএনপির জনপ্রিয়তা দেখে কেউ কেউ ভীত হয়ে পড়েছে। সেই ভীতি থেকেই নানা মিথ্যা প্রচারণা ও অপমানজনক বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। “যাদের নির্বাচনের কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই, তারাই বিএনপিকে অপমান করার চেষ্টা করছে,” বলেন তিনি।
নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে হবে গণতান্ত্রিক, শালীন ও উৎসবমুখর। নির্বাচন মানেই শত্রুতা নয়, বরং এটি জনগণের মত প্রকাশের একটি উৎসব। এই উৎসবকে কলুষিত করতে চাইলে তার দায় সংশ্লিষ্টদেরই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে “সংবেদনশীল” আখ্যা দিয়ে মির্জা আব্বাস নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আজকে কিছু ছেলে কথা বলে, যাদের ভেতর কোনো শ্রদ্ধা নেই। বেয়াদবের কপাল সবসময় খারাপ হয়।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, অশালীন ভাষা ও আচরণ রাজনীতিকে নিচে নামিয়ে আনে এবং শেষ পর্যন্ত তা সংশ্লিষ্টদেরই ক্ষতি করে।
মির্জা আব্বাস তাঁর বক্তব্যে বারবার জনগণের ওপর আস্থা রাখার কথা বলেন। তাঁর মতে, বিএনপি জনগণের দল, আর জনগণই এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই ভোটের মাঠে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে জনগণের রায় নিশ্চিত করাই বিএনপির প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, জনগণ যদি স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে, তবে ফলাফল নিয়ে কোনো সংশয় থাকবে না।
গণজমায়েতে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, ভোটের দিন কেন্দ্র পাহারা দেওয়া মানে সংঘাতে জড়ানো নয়। বরং আইন মেনে, শান্তভাবে ভোটারদের সহায়তা করা এবং যেকোনো অনিয়ম হলে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোই সঠিক পথ। এতে বিএনপির রাজনৈতিক ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা আব্বাসের এই বক্তব্য নির্বাচনী উত্তেজনার মধ্যেও বিএনপির একটি কৌশলগত বার্তা বহন করছে। একদিকে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করছেন, অন্যদিকে সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন। এতে সাধারণ ভোটারদের কাছেও বিএনপির ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
সব মিলিয়ে, মতিঝিলের এই গণজমায়েতে মির্জা আব্বাসের বক্তব্য বিএনপির নির্বাচনী কৌশল ও অবস্থানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। বিবাদ নয়, সংযম ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়েই যে বিএনপি বিজয়ের পথে এগোতে চায়—এটাই ছিল তাঁর বক্তব্যের মূল সুর। এখন দেখার বিষয়, এই আহ্বান মাঠপর্যায়ে কতটা প্রতিফলিত হয় এবং আসন্ন নির্বাচনে তার প্রভাব কীভাবে পড়ে।