সিলেট–সুনামগঞ্জে ভোটের মাঠে প্রবাসী জোয়ার, প্রচার ও খরচে বড় ভূমিকা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৯ বার
সিলেট–সুনামগঞ্জে ভোটের মাঠে প্রবাসী জোয়ার, প্রচার ও খরচে বড় ভূমিকা

প্রকাশ:  ২৯  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিলেট ও সুনামগঞ্জের রাজনীতিতে প্রবাসীদের প্রভাব নতুন কিছু নয়। তবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এবারের চিত্র যেন আরও স্পষ্ট, আরও দৃশ্যমান। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য—বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন প্রবাসীরা। কেউ ভোট দিতে, কেউ প্রিয় প্রার্থীর পক্ষে মাঠে কাজ করতে, কেউ আবার সরাসরি নির্বাচনী ব্যয়ের বড় অংশ জোগান দিতে। প্রবাসীদের এই সক্রিয় উপস্থিতিতে সিলেট–সুনামগঞ্জের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা।

যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আবদুর রব ২ জানুয়ারি দেশে ফিরেছেন। দেশে পা দিয়েই বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পাননি তিনি। প্রতিদিনই সিলেট জেলার একাধিক আসনে বিএনপির প্রার্থীদের পক্ষে গণসংযোগ করছেন, ভোট চাইছেন সাধারণ মানুষের কাছে। ভোট শেষ হলেই আবার ফিরে যাবেন যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর মতোই যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মোহাম্মদ আবুল হোসেন মাসখানেক আগে দেশে এসে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর এলাকায় বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নেমেছেন। বন্ধুবান্ধব নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে প্রচার চালাচ্ছেন তিনি।

এমন আবদুর রব বা আবুল হোসেন শুধু দুজন নন। তাঁদের মতো হাজারো প্রবাসী এখন সিলেট ও সুনামগঞ্জের ভোটের মাঠে সরব। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি ফ্রান্স, বেলজিয়ামসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার নানা প্রান্ত থেকে আসছেন তাঁরা। রাজনৈতিক পরিচয়ের দিক থেকে কেউ বিএনপির সমর্থক, কেউ জামায়াতে ইসলামীর, আবার কেউ এনসিপি, খেলাফত মজলিস কিংবা ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। দল–মতের ভিন্নতা থাকলেও একটি জায়গায় সবাই এক—ভোটকে কেন্দ্র করে নিজের এলাকার রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ।

তবে প্রবাসীদের এই সরব উপস্থিতির মাঝেও স্থানীয় অনেকের মন্তব্য, সিলেটের ভোটের মাঠ এখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি। তাঁদের ধারণা, ভোটের আরও কয়েক দিন বাকি থাকায় সামনে সময় যত গড়াবে, ততই আমেজ বাড়বে। পোস্টার লাগানো নিষেধ থাকায় প্রচলিত দৃশ্যমান উত্তেজনা কম হলেও ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি যে তুঙ্গে, তা মানছেন স্থানীয় রাজনীতিকেরা।

শুধু প্রচারে অংশ নেওয়াই নয়, সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনে বিভিন্ন দলের মনোনয়ন পেতে তৎপর ছিলেন অর্ধশতাধিক প্রবাসী। শেষ পর্যন্ত বিএনপি থেকে তিনজন প্রবাসী প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছেন। অন্যদিকে, অনেক প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের বড় অংশই আসছে প্রবাসী স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে। সিলেটের ছয়টি আসনে মোট ৩৩ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৭ জন হলফনামায় উল্লেখ করেছেন, তাঁদের নির্বাচনী ব্যয়ের একটি বড় অংশ প্রবাস থেকে আসবে।

যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আক্তার হোসেন রাজু ৩ জানুয়ারি দেশে ফিরেছেন। ছাত্রজীবনে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে কোনো দলীয় পদে নেই তিনি। ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হলেও ভোটের সময় দেশে আসার অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম। তিনি জানান, জীবনে একবারই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন, ২০০৮ সালে। দীর্ঘ সময় পর আবার ভোট দিতে এসেছেন। নিজের আসা–যাওয়া ও প্রচারের সব খরচই তিনি নিজে বহন করছেন।

প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতীতের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও প্রবাসীরা নির্বাচনের সময় দেশে আসতেন। তবে তখন তাঁদের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন। এবার রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষাপটে দৃশ্যপট বদলেছে। বিভিন্ন দলের সমর্থক প্রবাসীরা সমানতালে মাঠে নেমেছেন।

সিলেট-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরীর হলফনামা বলছে, নির্বাচনে তাঁর সম্ভাব্য ব্যয় ৬৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের আয় থেকে দেবেন ১৫ লাখ টাকা। ফ্রান্সপ্রবাসী এক শুভানুধ্যায়ী দেবেন ৩৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দুই চাচাতো ভাই এবং দেশে থাকা এক খালাতো বোন দেবেন আরও ১৫ লাখ টাকা। একই আসনে জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও তাঁদের ব্যয়ের বড় অংশ প্রবাসী আত্মীয়দের কাছ থেকে পাচ্ছেন।

সিলেট শহরের জিন্দাবাজার এলাকায় তরিতরকারি বিক্রেতা আলেক মিয়া বলেন, মাঝে মাঝে মাইকে প্রচার শোনা যায়, কেউ কেউ ভোট চাইছেন। তবে এখনো পুরোপুরি জমেনি। তাঁর মতো অনেকের ধারণা, ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই চিত্র বদলাবে। অন্যদিকে, জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, পোস্টার নিষেধাজ্ঞার কারণে দৃশ্যমানতা কম। তবে প্রার্থী ও কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে, উঠান বৈঠকের মাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছেন।

সুনামগঞ্জে প্রবাসীদের ভূমিকা আরও গভীর ও বিস্তৃত। এখানকার পাঁচটি আসনের ২৩ জন প্রার্থীর বড় একটি অংশের নির্বাচনী ব্যয়ে প্রবাসীদের অর্থ রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো প্রার্থীর ব্যয়ের পুরো টাকাই আসছে প্রবাস থেকে। বিশেষ করে জগন্নাথপুর, শান্তিগঞ্জ ও ছাতক উপজেলায় যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসীদের প্রভাব দীর্ঘদিনের।

সুনামগঞ্জ-৩ আসনে সাতজন প্রার্থীর মধ্যে চারজনই প্রবাসী। বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে ছিলেন এবং দলটির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর পক্ষে যুক্তরাজ্য থেকে শত শত নেতা-কর্মী দেশে এসে প্রচারে অংশ নিচ্ছেন। খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শাহীনুর পাশা চৌধুরী জানিয়েছেন, তাঁর পক্ষে ইতিমধ্যে ৩০ জনের বেশি যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দেশে এসে কাজ করছেন, সামনে আরও আসবেন।

সুনামগঞ্জের বিভিন্ন আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের পক্ষে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী স্বজনদের সক্রিয় ভূমিকা চোখে পড়ছে। প্রবাসীদের এই অংশগ্রহণ শুধু অর্থ বা প্রচারে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভোটকে একটি উৎসবের রূপ দেওয়ার চেষ্টা হিসেবেও দেখছেন স্থানীয়রা।

জগন্নাথপুর উপজেলা নাগরিক অধিকার ফোরামের আহ্বায়ক ও যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এম এ কাদির বলেন, প্রবাসীরা তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ এলাকার উন্নয়ন, সামাজিক ও মানবিক কাজে ব্যয় করেন। এ কারণেই এলাকার মানুষ তাঁদের শ্রদ্ধা করে। নির্বাচনে তাঁরা প্রার্থী হন, মাঠে কাজ করেন এবং ভোটের পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তোলেন।

সব মিলিয়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জের ভোটের মাঠে প্রবাসীদের উপস্থিতি শুধু রাজনৈতিক হিসাবেই নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবেও বড় এক বাস্তবতা। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, এই প্রবাসী জোয়ার ততই নির্বাচনী আমেজকে আরও রঙিন করে তুলবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত