সাইবার মামলায় কারাগারে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী কর্মকর্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৩ বার
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী কর্মকর্তা কারাগারে

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) এক নারী কর্মকর্তাকে ঘিরে সাইবার নিরাপত্তা আইনের একটি মামলা সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং আদালতের কঠোর অবস্থানের ফলে বিষয়টি শুধু একটি ব্যক্তিগত আইনি বিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, নৈতিকতা, সাইবার অপরাধ এবং নারী কর্মকর্তাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে পড়েছে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা দফতরের সহকারী পরিচালক সেলিনা বেগমকে সাইবার নিরাপত্তা আইনের একটি মামলায় জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বরিশাল সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শুনানি শেষে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সব মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ ইমন আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আদালত ও তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে বাদীপক্ষের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই আদালত আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেলিনা বেগম মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে তথ্য গোপন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করেছেন—এমন অভিযোগ আদালতে উত্থাপন করা হলে বিচারক বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, লালমনিরহাট জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাবেক এক কালচারাল কর্মকর্তা গত বছরের ৫ ডিসেম্বর সেলিনা বেগমের বিরুদ্ধে বরিশাল সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মানহানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ডিজিটাল হয়রানির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। মামলাটি দায়েরের পর থেকেই বিষয়টি তদন্তাধীন ছিল এবং একাধিকবার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

বৃহস্পতিবার সেলিনা বেগম আদালতে হাজির হলে তাকে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে তোলা হয়, যিনি সাইবার ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বপ্রাপ্ত আদালত হিসেবে বিষয়টি দেখছেন। শুনানি শেষে আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আদালতের এই আদেশের মধ্য দিয়ে মামলাটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করল বলে মনে করছেন আইন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সেলিনা বেগমের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। তার বিরুদ্ধে একাধিক বিয়ে, সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, ব্ল্যাকমেইল, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মতো অভিযোগ সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গনে আলোচনা সৃষ্টি করেছিল। যদিও এসব অভিযোগের অধিকাংশই এখনো আদালতের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে, তবুও সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

সম্প্রতি লালমনিরহাটের ওই সাবেক কালচারাল কর্মকর্তাকে একটি অফিসকক্ষে আটকে রেখে নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি প্রকাশের পর দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ভিডিওতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়, এক ব্যক্তিকে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে, যা মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে। যদিও ভিডিওটির সত্যতা ও প্রেক্ষাপট এখনো আদালতের বিচারাধীন, তবুও এটি মামলার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।

আইন বিশ্লেষকদের মতে, সাইবার নিরাপত্তা আইনের আওতায় এমন মামলাগুলো এখন আর কেবল অনলাইন জগতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে বাস্তব জীবন, পেশাগত অবস্থান ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর। একজন বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা হিসেবে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

এ বিষয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম বলেন, বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষে আদালতের বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং আদালতের রায়ের পরই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। তার বক্তব্যে প্রশাসনিক সতর্কতা ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অভিযোগ যত গুরুতরই হোক না কেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনের চোখে নির্দোষ যতক্ষণ না পর্যন্ত আদালত চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করেন। একই সঙ্গে তারা জোর দিয়ে বলছেন, ডিজিটাল অপরাধের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি, যাতে প্রকৃত অপরাধী শাস্তি পায় এবং নির্দোষ কেউ হয়রানির শিকার না হন।

এই মামলাটি একদিকে যেমন সাইবার অপরাধের জটিলতা তুলে ধরছে, অন্যদিকে তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে আনছে। আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম এবং চূড়ান্ত রায়ের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোসহ পুরো দেশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত