প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কণ্ঠে স্মৃতি, আবেগ ও রাজনৈতিক সংগ্রামের দীর্ঘ পথচলার প্রতিফলন ঘটেছে ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচনি পথসভায়। একসময় যে জনপদের মানুষের ভালোবাসা ও ত্যাগে রাজনীতির পথে শক্তি পেয়েছিলেন, সেই মানুষগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি স্মৃতিচারণ করেন বেদনাবিধুর অতীত, দমন-পীড়নের সময় এবং ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ লড়াইয়ের কথা। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ব্যক্তিগত কষ্ট, দলীয় সংগ্রাম এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশার এক মানবিক চিত্র।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালান্দর ইউনিয়নের কালিতলা এলাকায় আয়োজিত নির্বাচনি পথসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচনের সময় এলাকার মা-বোনেরা নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থে ডিম, মুরগি ও সবজি বিক্রি করে যে টাকা জোগাড় করেছিলেন, তা দিয়ে মালা বানিয়ে তাঁকে পরিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ভালোবাসা ও ত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “ওই ঋণ আমি কোনোদিন ভুলিনি। আপনাদের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বিগত নির্বাচনগুলোতে আমি কথা বলতে পারতাম না, শুধু কেঁদেছি।”
তার কণ্ঠে স্পষ্ট ছিল দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক বঞ্চনার বেদনা। তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে তিনি ও তাঁর দল জনগণের সামনে মুক্তভাবে দাঁড়াতে পারেননি। সে সময়কার সরকারকে ‘জুলুমবাজ’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের শুধু তাড়িয়ে বেড়ানো হয়েছে, মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। তাঁর নিজের বিরুদ্ধেই দেওয়া হয়েছিল ১১৭টি মামলা।
মির্জা ফখরুল আরও দাবি করেন, শুধু তিনি নন, পুরো ঠাকুরগাঁও জেলাজুড়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, জেলায় প্রায় ৭০টি মিথ্যা মামলায় সাড়ে সাত হাজারের মতো মানুষ আসামি ছিলেন। গড়েয়া ইউনিয়নে নয়জন মানুষকে গুলি করে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই সময় ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে বিএনপি সমর্থকদের। পুলিশি তৎপরতায় কেউ গাছে উঠে লুকিয়ে থেকেছেন, কেউ প্রচণ্ড শীতের রাতে ধানক্ষেতে আশ্রয় নিয়েছেন।
এই স্মৃতিগুলো তুলে ধরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ভোটাধিকার ও কথা বলার অধিকারের জন্যই তাঁদের আন্দোলন-সংগ্রাম ছিল। তাঁর দাবি অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন দমন-পীড়নের উদাহরণ।
ভোটারদের উদ্দেশে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন মানুষ ভোট দিতে পারেনি। সেই সুযোগ এবার এসেছে এবং এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, “আমাকে ধানের শীষে ভোট দিলে আমি সংসদে গিয়ে আপনাদের জন্য কাজ করতে পারবো। আমি কাজ করা মানুষ।”
মির্জা ফখরুল তাঁর বক্তব্যে উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরতার কথাও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিএনপি ভিক্ষার ওপর নির্ভরশীল রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। কাজ করে বাঁচাই তাদের লক্ষ্য। ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে উন্নয়নের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্থানীয় মা-বোন ও যুবসমাজকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে হবে। শিক্ষার সুযোগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারলে এই অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের মানুষ অবহেলিত। উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের জীবনমান উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং নারীর ক্ষমতায়নের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
পথসভায় উপস্থিত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও বক্তব্যটি আবেগের সঞ্চার করে। অনেকের চোখে জল দেখা যায়, আবার অনেকেই হাততালি দিয়ে তাঁর কথার প্রতি সমর্থন জানান। স্থানীয় বিএনপি নেতারা বলেন, মির্জা ফখরুলের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক আহ্বান নয়, বরং এটি ছিল দীর্ঘদিনের কষ্ট আর সংগ্রামের একটি দলিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের প্রাক্কালে মির্জা ফখরুলের এই বক্তব্য ভোটারদের আবেগে নাড়া দেওয়ার পাশাপাশি বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন ও দমন-পীড়নের বয়ানকে নতুন করে সামনে আনছে। ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তাঁর বক্তব্য দলীয় কর্মীদের চাঙা করতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
সব মিলিয়ে, ঠাকুরগাঁওয়ের এই পথসভা বিএনপির নির্বাচনি প্রচারণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠেছে। অতীতের কষ্ট, বর্তমানের প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সবকিছু মিলিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য ছিল মানবিক, আবেগঘন এবং রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।