প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের চট্টগ্রাম বিভাগীয় নির্বাচনী প্রচারণা সফর আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগে টানা জনসভা ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে দলটির নির্বাচনী বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই সফরের মূল লক্ষ্য। শুক্রবার সকালে ফেনী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত বিশাল জনসভায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচির সূচনা হয়, যা ঘিরে ভোর থেকেই ফেনী জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের এলাকা থেকে হাজারো মানুষ সভাস্থলে জড়ো হতে শুরু করেন।
জনসভার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগেই মাঠ পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ব্যানার, ফেস্টুন ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। দীর্ঘদিন পর বড় পরিসরে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে সাধারণ মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফেনীর জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ডা. শফিকুর রহমান দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান “নৈতিকতা, সুশাসন ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা” প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসার। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ হলেও দুর্নীতি, বৈষম্য ও অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতি। তিনি জনগণের ভোট ও সমর্থনের মাধ্যমেই সেই পরিবর্তন সম্ভব বলে মন্তব্য করেন।
জামায়াত আমির তার বক্তব্যে আরও বলেন, রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার লড়াই হিসেবে না দেখে জনগণের সেবার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তরুণ সমাজকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তাদের সচেতন ভূমিকার ওপর। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নৈতিকতার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী জাতি গঠনের জন্য তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
ফেনীর জনসভা শেষে ডা. শফিকুর রহমান বেলা ১১টায় নোয়াখালীর উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। নোয়াখালীকে তিনি ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিক সচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এই এলাকার মানুষ সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নোয়াখালীর জনগণ ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতির পক্ষে অবস্থান নেবে।
দুপুরের পর জামায়াত আমির বিকেল সাড়ে ৩টায় লক্ষ্মীপুরে পৌঁছাবেন। লক্ষ্মীপুরের কর্মসূচিতে স্থানীয় সমস্যা, বিশেষ করে নদীভাঙন, কর্মসংস্থান ও কৃষিখাতের সংকট নিয়ে বক্তব্য রাখার কথা রয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এই জেলায় তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাদের প্রত্যাশা ও অভিযোগ শোনার ওপর গুরুত্ব দেবেন। স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন, লক্ষ্মীপুরে জনসভাকে ঘিরে ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং বিপুল জনসমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে।
দিনের শেষ কর্মসূচি হিসেবে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ডা. শফিকুর রহমান কুমিল্লায় পৌঁছাবেন। কুমিল্লা নগরীতে আয়োজিত জনসভায় তিনি চট্টগ্রাম বিভাগের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, উন্নয়ন ভাবনা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে। কুমিল্লাকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করেন এবং এখান থেকে চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে নির্বাচনী প্রচারণার গতি আরও বাড়বে বলে দলীয় নেতারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম বিভাগে জামায়াত আমিরের এই সফর কেবল দলীয় কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। দীর্ঘদিন পর বড় আকারে প্রকাশ্য সমাবেশ ও জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে দলটি মাঠের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান জোরালো করতে চাইছে। বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের কাছে পৌঁছানোই এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় জনগণের প্রতিক্রিয়াও ছিল মিশ্র হলেও আগ্রহের কমতি দেখা যায়নি। ফেনীর জনসভায় অংশ নেওয়া অনেকেই জানিয়েছেন, তারা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির কথা ভাবছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, তারা বক্তৃতা শুনে সিদ্ধান্ত নিতে চান। এ ধরনের জনসমাগম রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বলে মত দিয়েছেন সমাজ বিশ্লেষকেরা।
নিরাপত্তার দিক থেকেও প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে ছিল। সভাস্থল ও আশপাশের এলাকায় পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি দেখা যায়। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কর্মসূচি সম্পন্ন হওয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ডা. শফিকুর রহমানের চট্টগ্রাম বিভাগীয় নির্বাচনী সফরের প্রথম দিনই ব্যাপক জনসমাগম ও রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফেনী থেকে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লা—এক দিনের এই টানা কর্মসূচি জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে এই সফরের ধারাবাহিকতা ও জনসাড়া দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।