আল–জাজিরাকে শফিকুর: জামায়াতের আমির পদে নারী নয়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫১ বার
আল–জাজিরাকে শফিকুর: জামায়াতের আমির পদে নারী নয়

প্রকাশ: ৩০  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল–জাজিরাকে দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দলটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পদ আমির হিসেবে নারীর দায়িত্ব গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। তাঁর এই মন্তব্য ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে। ‘বাংলাদেশ নির্বাচন: জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান’ শিরোনামে প্রচারিত সাক্ষাৎকারটি বৃহস্পতিবার আল–জাজিরার ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়। সাক্ষাৎকারটি নেন আল–জাজিরার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন।

সাক্ষাৎকারের সূচনাতেই সাংবাদিক উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী আবারও বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, এবারের নির্বাচনে দলটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হন দলটির আমির।

সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক শফিকুর রহমানের কাছে জানতে চান, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে নারীর ভূমিকা কী এবং সর্বোচ্চ পদে কোনো নারী আসতে পারেন কি না। উত্তরে তিনি বলেন, জামায়াতের আমির পদে নারীর দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর যুক্তির ব্যাখ্যায় তিনি ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরেন। শফিকুর রহমান বলেন, আল্লাহ প্রত্যেক মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন সত্তা ও দায়িত্ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। একজন পুরুষ যেমন সন্তান ধারণ বা বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন না, তেমনি নারীদের ক্ষেত্রেও কিছু স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাঁর ভাষায়, মাতৃত্ব একটি মহান দায়িত্ব, যা পালনের সময় একজন নারীর পক্ষে দলের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দায়িত্ব বহন করা বাস্তবসম্মত নয়। এই কারণেই জামায়াতের আমির পদে নারী আসার সুযোগ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তবে নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিয়ে জামায়াতের অবস্থান পুরোপুরি অস্বীকারমূলক নয় বলেও তিনি দাবি করেন। শফিকুর রহমান জানান, এবারের নির্বাচনে জামায়াতের পক্ষ থেকে কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি ঠিকই, কিন্তু ভবিষ্যতে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দলটি প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাঁর মতে, সমাজ ও রাজনীতিতে নারীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেটি নির্দিষ্ট কাঠামো ও সীমার মধ্যে হওয়া উচিত।

সাক্ষাৎকারে ইসলামী আইন বা শরিয়াহ চালুর প্রসঙ্গও উঠে আসে। জামায়াত ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশে ইসলামি আইন চালু করা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, এটি কোনো ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যদি দেশের মঙ্গল ও জনগণের কল্যাণের জন্য সংসদ মনে করে ইসলামি আইন প্রয়োজন, তবে সংসদই সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জামায়াত কখনোই জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু চাপিয়ে দেবে না।

বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন করা হয় সাক্ষাৎকারে। এ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, গণতন্ত্র মানে জনগণের মতামতকে সম্মান করা। তাঁর মতে, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে যদি ধর্মবিশ্বাসী মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়, তবে সেটিও গণতন্ত্রের পরিপন্থী। তিনি দাবি করেন, জামায়াত একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ক্ষমতায় যেতে চায় এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী।

সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতার বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন, যেখানে সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী ও ছায়ানট এবং কয়েকটি গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছিল। জামায়াতের উত্থান সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে—এমন উদ্বেগের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত এসব বক্তব্য সমর্থন করে না এবং ইতোমধ্যে নিন্দা জানিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইসলামী ছাত্রশিবির জামায়াতের কোনো অঙ্গসংগঠন নয় এবং এটি দলটির আইনি কাঠামোর অংশও নয়। তাঁর ভাষায়, মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু ভুল হলে তা সংশোধন করা জরুরি। কেউ যদি একই ভুল বারবার করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাক্ষাৎকারে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় জামায়াতের সম্পৃক্ততার অভিযোগও ওঠে। শফিকুর রহমান এসব অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, জামায়াতের কেউ কখনো সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বা ভাঙচুরে জড়িত ছিল না। গত ১৫ বছরে নানা ঘটনার জন্য দলটিকে দায়ী করা হলেও আদালতে একটি মামলাও প্রমাণিত হয়নি বলে তাঁর দাবি। আগস্টের অভ্যুত্থানের পর সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা নিয়ে জাতিসংঘের যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, সেটিও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং একে ‘মিথ্যা অপপ্রচার’ বলে উল্লেখ করেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শফিকুর রহমান বলেন, সে সময় জামায়াতের সিদ্ধান্ত ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কোনো সশস্ত্র বাহিনীর সিদ্ধান্ত নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তৎকালীন নেতারা মনে করেছিলেন, ভারতের সহায়তায় পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হলে বাংলাদেশ ভারতের আরেকটি আধিপত্যে পরিণত হতে পারে। আল–জাজিরার সাংবাদিক এ সময় জামায়াত–সংশ্লিষ্ট আধা সামরিক বাহিনীর হাতে বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগের কথা উল্লেখ করলে শফিকুর রহমান বলেন, সেই বাহিনীগুলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি দেশীয় কেউ অপরাধ করে থাকে, তবে স্বাধীনতার পর তাদের বিরুদ্ধে মামলা বা সাধারণ ডায়েরি কেন হয়নি। শেখ মুজিবুর রহমানের করা ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকায়ও সবাই পাকিস্তানি সেনা ছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ভারত প্রসঙ্গেও কথা বলেন জামায়াত আমির। শেখ হাসিনাকে ভারত ফেরত দিতে অস্বীকার করলে জামায়াত কী করবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দলটি ভারতের সঙ্গে ফলপ্রসূ সংলাপে আগ্রহী। তাঁর মতে, জামায়াত প্রতিবেশী কোনো দেশকে অস্বস্তিতে ফেলতে চায় না, তবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস প্রত্যাশা করে।

তরুণ প্রজন্ম জামায়াতকে গ্রহণ করবে বলেও আশাবাদ প্রকাশ করেন শফিকুর রহমান। এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে তিনি সাম্প্রতিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোর কথা উল্লেখ করেন, যেখানে জামায়াত–সমর্থিত ছাত্রসংগঠনের প্রার্থীরা ভালো ফল করেছে। তাঁর ভাষায়, তরুণরা বিশ্বাস করে, তাদের মর্যাদা ও অধিকার জামায়াতের মাধ্যমেই সুরক্ষিত হবে।

সব মিলিয়ে, আল–জাজিরাকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান, দর্শন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একাধিক স্পর্শকাতর বিষয়ে খোলামেলা বক্তব্য দিয়েছেন শফিকুর রহমান। বিশেষ করে নারীর নেতৃত্ব, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সংখ্যালঘু অধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে তাঁর মন্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনা তৈরি করবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত