প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর নিজ জেলা বগুড়ায় ফিরে মানবিক ও সামাজিক বার্তায় ভরপুর এক আবেগঘন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান। রাজনীতির ব্যস্ততা ও দীর্ঘ নির্বাসনের সময় পার করে নিজ জেলার মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার, যেখানে প্রতিটি মানুষ আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু-কিশোরদের পাশে দাঁড়িয়ে তারেক রহমানের এই আহ্বান শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং একটি মানবিক রাষ্ট্রদর্শনের প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন অনেকেই।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে বগুড়া শহরের একটি হোটেলে সিএসএফ গ্লোবালের উদ্যোগে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু-কিশোরদের মাঝে হুইলচেয়ার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমান। এই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান। দীর্ঘদিন পর বগুড়ার মাটিতে তারেক রহমানের সরাসরি উপস্থিতি স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও আবেগের সৃষ্টি করে। অনুষ্ঠানস্থলে সাধারণ মানুষের কাতারে মিশে গিয়ে তিনি যে বক্তব্য দেন, তা উপস্থিত সবার মন ছুঁয়ে যায়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, “আসুন আমরা সকলে মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা করি, যে বাংলাদেশে কমবেশি প্রত্যেকটা মানুষের একটা মর্যাদা তৈরি হবে এবং আত্মমর্যাদা নিয়ে প্রত্যেকে বেঁচে থাকতে পারবে।” তাঁর কণ্ঠে ছিল দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির প্রতিফলন। তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচার সুযোগ পায়।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, সমাজে অনেক সময় তাদের দুর্বল বা অক্ষম হিসেবে দেখা হয়, যা একেবারেই ভুল ধারণা। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, “তাদের অনেকের মধ্যে এমন অনেক গুণ আছে, যা আমাদের অনেকের নেই।” সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সব অবস্থান থেকে যদি এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো যায়, তাহলে বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য প্রতিভাবান মানুষ বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তার মতে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই সম্ভাবনাকে চিহ্নিত করা এবং বিকাশের সুযোগ তৈরি করা।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য খুব বড় কিছু করার প্রয়োজন নেই। শুধু তাদের জন্য সামান্য সুযোগ ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করলেই তারা অন্যদের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে এবং নিজেদের প্রতিভা বিকশিত করতে পারে। তারেক রহমান বলেন, “তারা আমাদের বাইরের কেউ নয়, তারা আমাদেরই অংশ। আমাদের প্রত্যেকের পরিবারের মধ্যেই হয়তো এমন কেউ না কেউ আছে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য ও দূরত্বের দেয়াল ভাঙার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবার উদ্দেশে তিনি একটি মানবিক শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, আজকের এই দিনে আমরা যদি প্রতিজ্ঞা করি যে যার যার অবস্থান থেকে যতটুকু সম্ভব প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াব, তাহলেই সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তারেক রহমানের এই আহ্বান রাজনৈতিক সীমানা ছাড়িয়ে একটি সার্বজনিক মানবিক দায়িত্বের কথাই তুলে ধরে।
এই অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো বগুড়ায় প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন ডা. জোবাইদা রহমান। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য। আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, বিএনপি একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তার বক্তব্যে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার ইঙ্গিতও স্পষ্ট ছিল।
অনুষ্ঠানে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ১০ জন শিশুকে হুইলচেয়ার উপহার দেওয়া হয়। তারেক রহমান নিজ হাতে শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের খোঁজখবর নেন এবং তাদের হাসি ও স্বতঃস্ফূর্ততায় মুগ্ধ হন। শিশুদের পরিবেশনায় গান উপভোগ করার সময় অনুষ্ঠানস্থলে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনেকের চোখে তখন আনন্দাশ্রু দেখা যায়। এই দৃশ্য যেন রাজনীতির কঠোর বাস্তবতার বাইরে এক মানবিক বাংলাদেশের ছবি তুলে ধরে।
অনুষ্ঠান শেষে তারেক রহমান বগুড়ায় নিজ হাতে গড়া বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল মসজিদে জুমার নামাজ আদায়ের কথা রয়েছে। এরপর তিনি ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ে হজরত শাহ সুলতান বলখী মাহী সওয়ার (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন। ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক এই সফরের মধ্য দিয়ে তিনি বগুড়ার সঙ্গে নিজের আবেগী সম্পর্কের কথাও নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিলেন। মাজার জিয়ারত শেষে তিনি রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করবেন বলে জানা গেছে।
দীর্ঘদিন পর নিজ জেলায় ফিরে তারেক রহমানের এই মানবিক কর্মসূচি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। অনেকেই বলছেন, এটি কেবল একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ নয়, বরং রাজনীতির ভাষায় মানবিক মূল্যবোধকে সামনে আনার একটি বার্তা। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নটি যে আগামীর রাজনীতিতে আরও গুরুত্ব পেতে পারে, তার ইঙ্গিতও এতে মিলেছে।
সব মিলিয়ে, বগুড়ার এই আয়োজন তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি স্পষ্ট প্রকাশ। আত্মমর্যাদার বাংলাদেশ গড়ার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা শুধু একটি বক্তৃতার অংশ নয়—বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দর্শনের প্রতিফলন। এই আহ্বান কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা সময়ই বলবে। তবে অন্তত এই দিনে বগুড়ার মাটিতে দাঁড়িয়ে অনেক মানুষ অনুভব করেছেন, রাজনীতির বাইরে মানবিকতার ভাষাও হতে পারে রাষ্ট্র গড়ার শক্তিশালী হাতিয়ার।