‘কুসুম’ হয়ে নতুন বছরের প্রথম স্বীকৃতি জয়ার ঝুলিতে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৯৭ বার
‘কুসুম’ হয়ে নতুন বছরের প্রথম স্বীকৃতি জয়ার ঝুলিতে

প্রকাশ: ৩০  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন বছরের শুরুতেই নিজের অভিনয়জীবনে আরও এক অনন্য সাফল্যের মুকুট পরলেন অভিনেত্রী জয়া আহসান। দুই বাংলার দর্শকের কাছে যিনি দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী অভিনয়, সংবেদনশীল চরিত্র নির্বাচন এবং সাহসী শিল্পীসত্তার প্রতীক, সেই জয়া এবার কলকাতার জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল জি২৪ ঘণ্টা আয়োজিত ‘বিনোদনের সেরা ২৪’ অ্যাওয়ার্ডে সমালোচকদের বিচারে সেরা অভিনেত্রীর সম্মান অর্জন করলেন। সুমন মুখার্জি পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’-তে কুসুম চরিত্রে তাঁর অনবদ্য অভিনয়ই এনে দিয়েছে এই মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি।

পুরস্কারপ্রাপ্তির খবর প্রকাশের পর থেকেই দুই বাংলার সংস্কৃতি অঙ্গনে শুভেচ্ছার ঢল নেমেছে। অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা, লেখক, নাট্যকর্মী এবং অসংখ্য ভক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জয়ার এই অর্জনকে অভিনন্দনে ভরিয়ে তুলেছেন। অনেকের কাছেই এটি শুধু একটি পুরস্কার নয়, বরং বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী নারী চরিত্রকে আধুনিক চলচ্চিত্র ভাষায় জীবন্ত করে তোলার স্বীকৃতি।

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে জয়া আহসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, “পুতুলনাচের ইতিকথা” সিনেমার জন্য বছরের প্রথম পুরস্কার পেয়ে আমি সম্মানিত বোধ করছি। জি২৪ ঘণ্টা আয়োজিত ‘বিনোদনের সেরা ২৪’ অনুষ্ঠানে সমালোচকদের বিচারে সেরা অভিনেত্রী হিসেবে এই স্বীকৃতি পাওয়া সত্যিই আনন্দের। কৃতজ্ঞ ও অভিভূত।” তাঁর এই সংক্ষিপ্ত অথচ আবেগপূর্ণ বক্তব্যেই ধরা পড়ে একজন শিল্পীর কাছে সৃষ্টিশীল স্বীকৃতির গুরুত্ব।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ১৯৩৪–৩৫ সালে ভারতবর্ষ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এই উপন্যাস মানবমনের জটিলতা, সামাজিক সংকট এবং কামনা-বাসনার দ্বন্দ্বকে যে গভীরতায় তুলে ধরেছে, তা আজও প্রাসঙ্গিক। প্রায় নয় দশক পর সেই সাহিত্যকর্ম অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ নিজেই ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করে পরিচালক সুমন মুখার্জি যে সাহসী প্রয়াস নিয়েছেন, তার কেন্দ্রে ছিল কুসুম চরিত্রটি—আর সেই চরিত্রে জয়া আহসানের নির্বাচন চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

গত বছরের আগস্ট মাসে পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’। মুক্তির পর থেকেই ছবিটি সমালোচকদের নজর কাড়ে এর নির্মাণভঙ্গি, সংলাপ, আবহসংগীত এবং বিশেষ করে অভিনয়ের জন্য। উপন্যাসের কুসুম চরিত্রকে পর্দায় রূপ দিতে গিয়ে জয়া আহসান যে সংবেদনশীলতা, সাহস এবং মানসিক গভীরতা দেখিয়েছেন, তা দর্শকদের দীর্ঘ সময় আলোচনায় রেখেছে।

এই ছবিতে জয়ার সহশিল্পী হিসেবে রয়েছেন আবীর চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় এবং অনন্যা চট্টোপাধ্যায়। আবীর শশী চরিত্রে, পরমব্রত কুমুদ চরিত্রে, ধৃতিমান যাদব এবং অনন্যা সেনদিদির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। প্রত্যেকেই নিজ নিজ চরিত্রে শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও কুসুম চরিত্রটি যেন আলাদা এক মাত্রা যোগ করেছে পুরো কাহিনিতে। অনেক সমালোচকের মতে, কুসুম ছাড়া এই গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যেত।

কুসুম চরিত্রটি নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জয়া আহসান নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছিলেন গভীরভাবে। তিনি বলেছিলেন, সাধারণত নারীদের কেবল কামনা-বাসনার বস্তু হিসেবেই তুলে ধরা হয়। কিন্তু কুসুমের নিজেরও কামনা-বাসনা আছে, আর সে তা গোপন করে না। কুসুম যেন একেবারে খোলা বই—তার মন, শরীর আর আত্মা একই সুরে বাঁধা। এখানেই শশীর সঙ্গে তার মূল পার্থক্য। কুসুম শশীর চরিত্রকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা রাখে। সে ভীষণ খোলা মনের, সতেজ ও প্রাণবন্ত একটি চরিত্র। এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, কুসুম চরিত্রকে জয়া কেবল অভিনয়ের বিষয় হিসেবে নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক ও মানসিক প্রতিবাদ হিসেবেও দেখেছেন।

জয়া আহসানের অভিনয়জীবন বরাবরই সাহসী চরিত্র বেছে নেওয়ার জন্য পরিচিত। বাংলাদেশে ক্যারিয়ার শুরু করলেও গত এক দশকে তিনি নিজেকে দুই বাংলার অন্যতম শক্তিশালী অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ‘বিসর্জন’, ‘রাজকাহিনী’, ‘এক যে ছিল রাজা’, ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’, ‘দেবী’ কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের নানা চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় প্রমাণ করেছে, তিনি কেবল জনপ্রিয়তার পেছনে ছোটেন না; বরং চরিত্রের গভীরতা ও গল্পের প্রয়োজনকেই অগ্রাধিকার দেন।

‘পুতুলনাচের ইতিকথা’-তে কুসুম চরিত্র সেই ধারাবাহিকতারই আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ। একজন নারী চরিত্রকে সামাজিক শেকল, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিজের অন্তর্গত কামনা-বাসনার দ্বন্দ্বের মধ্যে দাঁড় করিয়ে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বাংলা চলচ্চিত্রে খুব বেশি দেখা যায় না। জয়ার অভিনয় এই চরিত্রকে শুধু সাহিত্যের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে সমকালীন দর্শকের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করেছে।

জি২৪ ঘণ্টার ‘বিনোদনের সেরা ২৪’ অ্যাওয়ার্ড মূলত বিনোদন জগতের সেরা কাজগুলোকে সম্মান জানানোর একটি আয়োজন। এখানে সমালোচকদের বিচারে পাওয়া পুরস্কারকে শিল্পীরা বিশেষ গুরুত্ব দেন, কারণ এটি জনপ্রিয়তার চেয়ে গুণগত মানকে প্রাধান্য দেয়। সেই বিবেচনায় জয়া আহসানের এই অর্জন তাঁর অভিনয়দক্ষতার প্রতি সমালোচক মহলের আস্থারই প্রতিফলন।

নতুন বছরের শুরুতেই এমন স্বীকৃতি জয়া আহসানের সামনে ভবিষ্যতের পথ আরও উজ্জ্বল করবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দুই বাংলার সিনেমায় তিনি যে ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী নারী চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে চলেছেন, এই পুরস্কার যেন সেই যাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘কুসুম’ হয়ে সেরা অভিনেত্রীর এই পুরস্কার শুধু জয়া আহসানের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি বাংলা চলচ্চিত্রে সাহসী নারী চরিত্র ও সাহিত্যনির্ভর সিনেমার গুরুত্বকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। দর্শক ও সমালোচকদের কাছে তাই এই অর্জন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com