প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে কুমিল্লা অঞ্চলের রাজনীতিতে একের পর এক নাটকীয় মোড় দেখা যাচ্ছে। কুমিল্লা-১০ আসন লালমাই–নাঙ্গলকোটে এবার নির্বাচনী লড়াই থেকে ছিটকে পড়লেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়া। দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আইনি জটিলতার কারণে তাঁর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই বলে চূড়ান্তভাবে রায় দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এই সিদ্ধান্তে স্থানীয় রাজনীতি যেমন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে তেমনি জাতীয় পর্যায়েও বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, বিদ্যমান সংবিধান ও নির্বাচন আইন অনুযায়ী কোনো প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল রেখে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রমাণ বিশ্লেষণ করে আদালত মনে করেন, মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়ার ক্ষেত্রে এই বিধান লঙ্ঘনের বিষয়টি সুস্পষ্ট। ফলে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
এই রায়ের পেছনের প্রেক্ষাপট বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। চলতি মাসের ২২ জানুয়ারি বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়ার প্রার্থিতা বাতিলের বৈধতা নিয়ে করা একটি রিট আবেদন খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। ওই রিটে গফুর ভূঁইয়ার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তাঁর নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং আইনগতভাবে তিনি নির্বাচন করতে বাধাগ্রস্ত হওয়ার কথা নয়। তবে হাইকোর্ট সেই যুক্তি গ্রহণ করেননি।
এর আগে গফুর ভূঁইয়ার প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ করে আপিল করেছিলেন বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের প্রার্থী কাজী নুরে আলম সিদ্দিকী। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও তথ্য গোপন করে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। নির্বাচন আইন অনুযায়ী এটি গুরুতর অপরাধ এবং এতে প্রার্থিতা বাতিলযোগ্য। এই আপিলের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
নির্বাচন কমিশনের সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গফুর ভূঁইয়ার পক্ষ থেকে আইনি লড়াই চালানো হলেও শেষ পর্যন্ত তা টেকেনি। হাইকোর্টে রিট খারিজ এবং পরে আপিল বিভাগের রায়ে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হলো। ফলে কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে তাঁর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সব পথ বন্ধ হয়ে গেল।
এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। লালমাই ও নাঙ্গলকোট এলাকায় বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে হতাশা লক্ষ্য করা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, জনপ্রিয় একজন প্রার্থীকে নির্বাচনী মাঠের বাইরে চলে যেতে হওয়ায় দলটি বড় ধাক্কা খেল। আবার অন্যদিকে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী অন্যান্য দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে নতুন করে কৌশল সাজানোর তৎপরতা শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুটি বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে বরাবরই স্পর্শকাতর। অতীতে এই অভিযোগে একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে এবং আদালতও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। এবারের রায় সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। এতে ভবিষ্যতে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো আরও সতর্ক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ঘটনার তাৎপর্য আরও বাড়িয়েছে একই দিনে কুমিল্লা জেলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রায়। কুমিল্লা-৪ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বী এবং বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীকেও নির্বাচনে অংশ নিতে না পারার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন আদালত। ঋণখেলাপির অভিযোগে তাঁর মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। ফলে কুমিল্লা জেলার দুইটি আসনেই বিএনপি প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়ার ঘটনা রাজনৈতিকভাবে বড় বার্তা বহন করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একই দিনে একই বেঞ্চ থেকে দেওয়া এই দুই রায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং আইন প্রয়োগের কঠোরতার দিকটি স্পষ্ট করেছে। আদালত বারবারই ইঙ্গিত দিয়েছে যে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে এমন কোনো অনিয়ম বা আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। এতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে বলে মনে করেন তাঁরা।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আদালতের রায় পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট আসনগুলোর প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, আইনি জটিলতা নিষ্পত্তি হওয়ায় এখন নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্বাচনী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। কমিশনের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে তারা বদ্ধপরিকর।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এই রায় নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো সীমিত। তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা চলছে। বিকল্প প্রার্থী বা নির্বাচনী কৌশল পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। দলটির নেতারা বলছেন, তাঁরা আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলেও রাজনৈতিকভাবে এই সিদ্ধান্ত তাঁদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে মুক্তিজোটসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা এই রায়কে আইনের শাসনের বিজয় হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, নাগরিকত্ব বা আর্থিক অনিয়মের মতো গুরুতর বিষয়ে কঠোর অবস্থান না নিলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ত। আদালতের এই অবস্থান ভবিষ্যতে প্রার্থীদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দিল।
সব মিলিয়ে কুমিল্লা-১০ আসনে মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়ার প্রার্থিতা বাতিলের ঘটনা শুধু একটি আসনের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে আইনি লড়াই, মনোনয়ন যাচাই এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। ভোটারদের সামনে এখন নতুন প্রার্থী ও নতুন সমীকরণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসে গেছে।