প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুল আলোচিত জুলাই আন্দোলন নিয়ে এক বিস্ময়কর ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। ভারতের কলকাতায় অনুষ্ঠিত এক বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি প্রথমবারের মতো ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী জুলাই আন্দোলনে ছাত্র ও সাধারণ মানুষের মৃত্যুর দায় নিজের কাঁধে নেওয়ার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। এতদিন এই বিষয়ে সরাসরি দায় স্বীকার না করলেও, সোমবারের ওই বক্তৃতায় তার কণ্ঠে অনুশোচনা ও আত্মসমালোচনার সুর স্পষ্ট ছিল। একই সঙ্গে তিনি আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে কড়া ভাষায় নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
কলকাতার বিজেপিঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক মঞ্চ ‘খোলা হাওয়া’ আয়োজিত বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে যুক্ত ছিলেন সজীব ওয়াজেদ জয়। প্রায় আধা ঘণ্টাব্যাপী বক্তৃতায় তিনি জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, সরকারের ভূমিকা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে স্বীকারোক্তি, ব্যাখ্যা ও সতর্কবার্তা—যা মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় তোলে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তাতে বহু ছাত্র ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই ঘটনার দায় এতদিন সরকার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রত্যক্ষভাবে স্বীকার করেননি বলে সমালোচনা ছিল। কলকাতার অনুষ্ঠানে জয় বলেন, জুলাই আন্দোলনে যত নিরপরাধ ছাত্র ও সাধারণ মানুষ মারা গেছেন, তার সম্পূর্ণ দায় তিনি নিজের ওপর নিচ্ছেন। তার এই বক্তব্য অনেকের কাছে একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক স্বীকারোক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, আবার কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিক কৌশল বলেও দেখছেন।
বক্তৃতায় জয় স্বীকার করেন যে, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের দাবি ন্যায্য ছিল। তার ভাষায়, সরকার আগেই কোটা বাতিল করেছিল, কিন্তু আদালতের নির্দেশে তা পুনর্বহাল হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এই সংকট সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে না পারাকে তিনি সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে মৃত্যুর দায় স্বীকার করলেও আন্দোলনের নেপথ্যে ষড়যন্ত্রের অভিযোগের বিষয়ে তিনি তার অবস্থানে অনড় থাকেন।
জয়ের দাবি অনুযায়ী, শেখ হাসিনার একটি অডিও রেকর্ড প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে দেখা যায় যে কিছু গোষ্ঠী থানায় হামলা চালাচ্ছিল এবং সেখান থেকেই পরিস্থিতি হিংসাত্মক মোড় নেয়। তিনি বলেন, সরকার বা পুলিশ আগ বাড়িয়ে সহিংসতা শুরু করেনি; বরং আন্দোলনের আড়ালে থাকা কট্টরপন্থি ও জঙ্গি শক্তিগুলো অগ্নিসংযোগ ও বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত ঘটায়। এই বক্তব্য নিয়ে ইতোমধ্যেই ভিন্নমত ও বিতর্ক শুরু হয়েছে, কারণ আন্দোলনের সময়কার ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।
জয়ের বক্তৃতার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ রেখে এবং অন্যান্য প্রগতিশীল দলকে কোণঠাসা করে যে নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে, তা একতরফা ও প্রহসনমূলক। তার মতে, এই নির্বাচন এখন বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এক ধরনের দ্বিমুখী লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, জাতীয় পার্টির মতো দলগুলোকেও কার্যকরভাবে প্রচারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না, যা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
জয় বলেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনই জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত করতে পারে না। তিনি এই নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে অগণতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে বলেন, এভাবে আয়োজিত ভোট ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, বর্তমান নির্বাচনি কাঠামোর প্রতি তার গভীর অনাস্থা।
একই সঙ্গে তিনি আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ করে ভারতের প্রসঙ্গ টেনে সতর্কবার্তা দেন। জয়ের দাবি, বিএনপি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে জামায়াত ও পাকিস্তান নেপথ্য থেকে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পাচ্ছে। তার আশঙ্কা, জামায়াত সরাসরি সরকারে না থাকলেও পর্দার আড়াল থেকে সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে, যা ভারতের পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হওয়া থেকে আটকানোর এটাই শেষ সুযোগ।
জয় তার বক্তৃতায় আরও বলেন, ৫ থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে যে কয়েকশ আওয়ামী লীগ কর্মী ও পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন, সেই দায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এড়াতে পারে না। তার মতে, ওই সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্যও বর্তমান প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক উসকে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সজীব ওয়াজেদ জয়ের এই বক্তব্য একদিকে যেমন জুলাই আন্দোলন নিয়ে প্রথম প্রকাশ্য দায় স্বীকারের নজির তৈরি করেছে, তেমনি অন্যদিকে আসন্ন নির্বাচন ও আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে তার কঠোর অবস্থান নতুন রাজনৈতিক সমীকরণকে সামনে আনছে। তবে তারা এটাও বলছেন, এই বক্তব্যের বাস্তব রাজনৈতিক প্রভাব নির্ভর করবে দেশীয় রাজনীতিতে এর প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক মহলের অবস্থানের ওপর।
সব মিলিয়ে, কলকাতার এই ভার্চুয়াল বক্তৃতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে। জুলাই আন্দোলনের দায় স্বীকার, সরকারের ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি এবং আসন্ন নির্বাচন নিয়ে কড়া সমালোচনা—এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।