জিপিএ-৫-এর উন্মাদনা নয়, সৎ জীবনের উদযাপন হোক শিক্ষার আসল উদাহরণ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই, ২০২৫
  • ২৯ বার
জিপিএ-৫-এর উন্মাদনা নয়, সৎ জীবনের উদযাপন হোক শিক্ষার আসল উদাহরণ

প্রকাশ: ১৫ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

দেশের অন্যতম আলোচিত ইসলামিক চিন্তাবিদ ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ সম্প্রতি একটি সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছেন, যা ইতোমধ্যে সমাজজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলকে ঘিরে সমাজে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠার বিরুদ্ধে তিনি তাঁর যুক্তিপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরেছেন, যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও পারিবারিক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার দরজা খুলে দেয়।

শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, প্রতিবছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার দিন দেশে যে ‘লাগামহীন উন্মাদনা’ দেখা যায়, তা একটি অস্বাস্থ্যকর সামাজিক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। তিনি লেখেন, “জিপিএ-৫ পেলে মিষ্টির বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়, অথচ সন্তান বিপদের মুখে সত্য কথা বললে, ঘুষ না নিলে বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে সেই আনন্দে একটি মিষ্টির টুকরোও খাওয়ানো হয় না—এমনকি বাবা-মার মুখেও তৃপ্তির হাসি দেখা যায় না।”

এই চর্চা যে কেবল অসামঞ্জস্যপূর্ণ তাই নয়, বরং এর গভীরে রয়েছে একটি বিপজ্জনক বার্তা—সফলতা মানেই ভালো ফলাফল, ভালো গ্রেড, এবং বাহ্যিক স্বীকৃতি। এই মানসিকতার ফলে সমাজে গড়ে উঠছে এক ধরণের ‘নির্মম প্রতিযোগিতা’, যেখানে সৎ থাকার বা নৈতিকতার কোনও মূল্য নেই। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন, “সততা নয়, বরং পরীক্ষায় পাস করাই হয়ে উঠেছে জীবনের প্রধান লক্ষ্য। ফলে অনেকে সন্তানকে নকল করতেও অনুমতি দেন।”

শিক্ষার্থীদের উপর সামাজিক ও পারিবারিক চাপের চিত্র টেনে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, যারা ভালো ফলাফল করতে পারে না, তারা অপরাধবোধে ভোগে, হতাশ হয়ে পড়ে এবং কখনো কখনো চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের পাশাপাশি গণমাধ্যমগুলোকেও দায়ী করেছেন তিনি। পরীক্ষার দিনগুলোতে ফলাফল নিয়ে যেভাবে ‘উৎসবমুখর সংবাদ কাভারেজ’ দেওয়া হয়, তা সারা বিশ্বের তুলনায় এক অনন্য ব্যতিক্রম। এই একমুখী আনন্দায়োজনে যারা পিছিয়ে পড়ে, তাদের মানসিক যন্ত্রণা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও বেড়ে যায়।

তিনি লেখেন, “একটি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অবশ্যই আনন্দের বিষয়। কিন্তু সেই আনন্দ নির্দিষ্ট মাত্রায় উদযাপন করাই শোভনীয়। সব কিছুরই একটা মাত্রা থাকা উচিত।” পাশাপাশি তিনি মনে করিয়ে দেন, “জিপিএ-৫ একটি সাময়িক অর্জন, কিন্তু একজন মুসলমানের চূড়ান্ত সাফল্য তখনই হবে, যখন সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।”

এই প্রসঙ্গে তিনি কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা’আলা বলেছেন, জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়া এবং জান্নাতে প্রবেশ করাই আসল সফলতা। একজন মুমিন তাই সাময়িক অর্জনের উন্মাদনায় মেতে না উঠে, নীরবে-নিভৃতে চূড়ান্ত সফলতার পথেই নিজেকে নিয়োজিত রাখে।”

শায়খ আহমাদুল্লাহর এই বক্তব্য সমাজের প্রচলিত ধারার বিরুদ্ধে এক সজীব প্রতিবাদ এবং বিকল্প এক দৃষ্টিভঙ্গির আহ্বান। পরীক্ষার ফলাফলকে ঘিরে আমাদের সমাজে যে একমাত্রিক এবং সীমিত বোধের উৎসব চলে, সেটি নতুন করে ভাববার সুযোগ করে দেয় এই বক্তব্য। একটি শিশুর সত্যভাষণ, আত্মমর্যাদা, নৈতিকতা—এসবের উদযাপনও যে হওয়া উচিত, এই বিষয়টি সামনে এনেছেন তিনি।

এই পোস্টে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আমরা কি আমাদের সন্তানদের মানুষ হিসেবে গড়তে পারছি, নাকি শুধুই একটি নাম্বার বা গ্রেডের পেছনে ছুটে যাওয়া যন্ত্রে পরিণত করছি? শায়খ আহমাদুল্লাহর বক্তব্য তাই কেবল একটি ধর্মীয় মতামত নয়, বরং এটি সময়োপযোগী এক সামাজিক সমালোচনা এবং আত্মজিজ্ঞাসার অনুরণন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত