গেজেট প্রকাশ, শপথে নতুন সরকারের পথচলা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৩ বার
গেজেট প্রকাশ, শপথে নতুন সরকারের পথচলা

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। শুক্রবার রাতেই কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদের সই করা প্রজ্ঞাপনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, মাতার নাম এবং ঠিকানা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্য দিয়ে নতুন সংসদ গঠনের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো এবং শপথের প্রস্তুতিও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে যে উত্তেজনা ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, গেজেট প্রকাশ সেই প্রক্রিয়াকে আইনি ভিত্তি দিল। সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচিত সদস্যদের গেজেট প্রকাশের পরই তাঁদের শপথ গ্রহণের আয়োজন করা হয়। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সূত্র জানিয়েছে, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াতে পারেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। সে ক্ষেত্রে আগামী সোমবার অথবা মঙ্গলবার শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতে পারে। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, যেদিন সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন, সেদিনই নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরাও শপথ নিতে পারেন, যা দেশের প্রশাসনিক ধারাবাহিকতায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, সাধারণত বিদায়ী সংসদের স্পিকার নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ পড়ান। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বা তাঁর মনোনীত ব্যক্তি এ দায়িত্ব পালন করার কথা। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শপথ অনুষ্ঠিত না হলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াতে পারেন। ফলে সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরেই দ্রুত সরকার গঠনের পথ সুগম রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট গ্রহণ হয়। একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে ভোট স্থগিত ছিল। নির্বাচন কমিশন শুক্রবার ২৯৭টি আসনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার কারণে দুটি আসনের ফলাফলের গেজেট আপাতত প্রকাশ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই দুটি আসনের ফল স্থগিত থাকবে বলে জানা গেছে।

ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। ফল ঘোষণা স্থগিত থাকা দুটি আসনেও দলটির প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিএনপির শরিক দলগুলো পেয়েছে আরও তিনটি আসন। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্য শরিকেরা পেয়েছে ৯টি আসন। এই ফলাফল দেশের রাজনৈতিক সমীকরণে একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, ভোটের ফলাফল একটি নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন পর এমন একটি সংসদ গঠিত হচ্ছে, যেখানে বিরোধী ও শরিক শক্তিগুলোর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। এতে সংসদীয় বিতর্ক, আইন প্রণয়ন এবং নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বহুমাত্রিক মতামতের প্রতিফলন ঘটতে পারে। একই সঙ্গে স্থিতিশীলতা রক্ষা ও জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে নতুন সরকারের ওপর থাকবে বাড়তি দায়িত্ব।

গেজেট প্রকাশের পর রাজধানীতে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়ে দেখা গেছে উৎসবমুখর পরিবেশ। নবনির্বাচিত সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় সমর্থকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। অনেক জায়গায় বিজয় মিছিল ও কৃতজ্ঞতা সমাবেশ হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে বিজয় উদ্‌যাপন কোনোভাবেই জনদুর্ভোগ বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত না করে।

নির্বাচন ঘিরে দেশের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পর্যবেক্ষক সংস্থা ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, অধিকাংশ কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে এবং বিচ্ছিন্ন কিছু অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় দুটি আসনের ফলাফল স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত কমিশনের আইনি বাধ্যবাধকতার অংশ বলেও জানানো হয়েছে।

এদিকে নতুন সংসদের শপথ অনুষ্ঠানকে ঘিরে প্রশাসনিক প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে এবং প্রটোকল সংক্রান্ত প্রস্তুতিও প্রায় সম্পন্ন। রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে সম্ভাব্য মন্ত্রিসভার আকার, কাঠামো ও অগ্রাধিকার বিষয়ে। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের সংস্কার—এসব ইস্যু নতুন সরকারের প্রথম দিকের নীতিগত অগ্রাধিকার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হলো। ভোটারদের প্রত্যাশা এখন দ্রুত কার্যকর সরকার গঠন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, তারা জনগণের রায়কে সম্মান করেন এবং সংসদে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন। বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকেও গঠনমূলক ভূমিকার অঙ্গীকার শোনা গেছে।

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিটি নির্বাচনই নতুন বার্তা বয়ে আনে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও তার ব্যতিক্রম নয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শপথ নেওয়ার পর সংসদ অধিবেশন শুরু হলে দেশের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া নতুন গতি পাবে। একই সঙ্গে নীতি-আদর্শের পার্থক্য সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জও সামনে থাকবে।

গেজেট প্রকাশের এই মুহূর্ত তাই কেবল একটি প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর দৃঢ়তার প্রতীক। এখন সবার দৃষ্টি শপথ অনুষ্ঠানের দিকে, যেখানে নতুন সংসদ ও সম্ভাব্য সরকার দেশের সামনে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা উপস্থাপন করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত