৬০ বছরে প্রথম এমপি গয়েশ্বর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৮ বার
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এমপি

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব কমই দেখা যায়, যেখানে একজন রাজনীতিক ছয় দশকের বেশি সময় সক্রিয় রাজনীতি করার পর প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। সেই বিরল ঘটনাই এবার ঘটেছে প্রবীণ রাজনীতিক গয়েশ্বর চন্দ্র রায়–এর জীবনে। দীর্ঘ ৬০ বছরের রাজনৈতিক পথচলার পর তিনি অবশেষে সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পেলেন, যা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আসন ঢাকা–৩ থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৯৮ হাজার ৭৮৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন তিনি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন শাহিনুর ইসলাম, যিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচন করে পান ৮২ হাজার ২৩২ ভোট। ফলাফল ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়, কারণ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত গয়েশ্বরের এই জয় অনেকের কাছে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে।

এর আগে তিনি ২০০৮ সালের নবম ও ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, কিন্তু সাফল্য পাননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময়ের ব্যর্থতার পর এমন বিজয় একজন রাজনীতিকের ব্যক্তিগত অধ্যবসায় ও দলীয় আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখা যেতে পারে।

১৯৫১ সালে ঢাকার কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নের মির্জাপুর রায় পরিবারে জন্ম নেওয়া গয়েশ্বর চন্দ্র রায় অল্প বয়সেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে স্কুল জীবনে প্রগতিশীল ধারার রাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। ১৯৭০-এর দশকে তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল–এর সদস্য হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, যা তার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যোগসূত্র তৈরি করে। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে তিনি জাতীয়তাবাদী যুবদল–এ যোগ দেন এবং সেখান থেকেই বিএনপির মূল রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

দীর্ঘ সময় সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৮৭ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত যুবদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দলীয় সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য বলে রাজনৈতিক মহলে স্বীকৃত। বর্তমানে তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। রাজনৈতিক জীবনে তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তারও হতে হয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন বলে অনেকে মনে করেন।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তার মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতা। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত হন এবং ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়–এর প্রতিমন্ত্রী ও একই সময়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়–এর প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকাকালে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে তার ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি অন্যতম প্রভাবশালী হিন্দু নেতা হিসেবেও পরিচিত। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অধিকার প্রশ্নে তিনি বহুবার বক্তব্য রেখেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার নির্বাচনী বিজয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বের দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। একই সঙ্গে তার পারিবারিক সম্পর্কও রাজনৈতিক অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত। তার ছেলে অমিতাভ রায়ের সঙ্গে বিএনপি নেতা নিতাই রায় চৌধুরী–এর মেয়ে নিপুণ রায় চৌধুরী–এর বিয়ে হয়েছে, যা দুই রাজনৈতিক পরিবারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।

সাম্প্রতিক নির্বাচনে নিতাই রায় চৌধুরী নিজেও মাগুরা–২ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে একই রাজনৈতিক পরিবারের দুই প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব সংসদে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

এক আলাপচারিতায় গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জানান, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনো দলের কাছে মনোনয়ন চাননি। ২০০৮ ও ২০১৮ সালে দল থেকেই তাকে প্রার্থী করা হয়েছিল। তার দাবি, ওই নির্বাচনে তিনি পরাজিত হলেও তা ছিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফল। তিনি বলেন, ক্ষমতার লিপ্সা কখনো তাকে আকৃষ্ট করেনি; বরং তিনি সবসময় নিজেকে একজন আদর্শ রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করেছেন। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নানা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিনের বাস্তবতা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গয়েশ্বরের বিজয়কে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। এটি একদিকে দীর্ঘদিনের সংগঠনভিত্তিক রাজনীতির ফল, অন্যদিকে দলের ভেতরে অভিজ্ঞ নেতাদের প্রতি আস্থার প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করে যে দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যবসায় ও সাংগঠনিক কাজ শেষ পর্যন্ত ফল দিতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক নেতাই দীর্ঘ সময় রাজনীতি করেও সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ পাননি। সেই তুলনায় গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের এই অর্জন রাজনৈতিক জীবনের এক ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তার সংসদে উপস্থিতি অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতার দৃষ্টান্ত হিসেবে সংসদীয় বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ছয় দশকের রাজনৈতিক পথচলার পর সংসদ সদস্য হিসেবে অভিষেক শুধু একজন নেতার ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অধ্যবসায়, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি এবং দলীয় আনুগত্যের একটি উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। রাজনৈতিক অঙ্গনের বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তার এই অর্জন সমর্থকদের কাছে যেমন গর্বের বিষয়, তেমনি সমালোচকদের কাছেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত