আদানি চুক্তি নিয়ে চাপে সরকার, পর্যালোচনা শুরু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৩ বার
আদানি চুক্তি পর্যালোচনা সরকার

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপ–এর সঙ্গে স্বাক্ষরিত বহুল আলোচিত বিদ্যুৎ চুক্তি নতুন করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সম্প্রতি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে চুক্তিটির শর্ত, ব্যয় কাঠামো এবং জাতীয় স্বার্থের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে চারজন মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, আন্তর্জাতিক চুক্তি বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি বিশ্লেষকরা অংশ নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শুধু আদানি নয়, অতীত সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে করা অন্যান্য চুক্তিও আলোচনায় এসেছে।

সরকারি পর্যায়ের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে Adani Power Limited–এর সঙ্গে করা দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে চুক্তির প্রতিটি ধারা পরীক্ষা করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তারা বিশেষজ্ঞদের মতামত নিচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে আরও আলোচনা করা হবে। একই বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, জাতীয় কমিটির সুপারিশকে গুরুত্ব দিয়েই সরকার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

এই চুক্তি পর্যালোচনার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে একটি জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনের মাধ্যমে। ওই কমিটি দাবি করেছে, চুক্তির কিছু ধারা বাংলাদেশের জন্য আর্থিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। কমিটির সদস্য ও অর্থনীতিবিদ মোশতাক হোসেন খান, যিনি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন–এর অধ্যাপক, বলেছেন যে চুক্তির মূল্য কাঠামো ও শর্তাবলীতে গুরুতর অসামঞ্জস্য রয়েছে এবং সরকার ইতিবাচকভাবে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করছে।

চুক্তিটির ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি–র ঢাকা সফরের সময় প্রাথমিক সমঝোতার মাধ্যমে প্রকল্পটির ভিত্তি তৈরি হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মোদির উপস্থিতিতে ২৫ বছরের জন্য এক হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয় ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে।

সরকারি নথি ও বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আদানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড–এর হিসাব বলছে, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে আদানি বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা, যেখানে অন্যান্য উৎস থেকে বিদ্যুতের দাম ৮ থেকে ১০ টাকার মধ্যে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই মূল্য পার্থক্য জাতীয় বিদ্যুৎ ভর্তুকির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

চুক্তির আরেকটি আলোচিত ধারা হলো ক্যাপাসিটি চার্জ, যার আওতায় বিদ্যুৎ না নিলেও নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হয়। সূত্র বলছে, এ বাবদ প্রতি মাসে বাংলাদেশকে ৪৫০ কোটি টাকার বেশি দিতে হচ্ছে। গত দুই অর্থবছরে বিদ্যুৎ আমদানি বাবদ মোট বিল পরিশোধ হয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি, আর চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে মোট পরিশোধ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির মূল্য নির্ধারণে এমন একটি সূচক ব্যবহার করা হয়েছে যা আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি ব্যয় তৈরি করছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, যখন অন্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ আমদানির মূল্য ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৪৬ সেন্ট, তখন আদানির সঙ্গে চুক্তি করা হয় ৮ দশমিক ৬১ সেন্টে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সমন্বয়ের ফলে মূল্য বেড়ে ১৪ সেন্টের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এতে বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি।

সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও পরিকল্পনাহীন প্রকল্প অনুমোদন ও চুক্তির কারণে কিছু কেন্দ্র অলস পড়ে আছে। একই সময়ে বিদেশি বিদ্যুৎ আমদানির প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। চুক্তির আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো, ভারতের অভ্যন্তরীণ কোনো কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায়ভার আংশিকভাবে বাংলাদেশের ওপর বর্তাতে পারে—এমন শর্ত নিয়েও আলোচনায় উঠেছে।

নতুন সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, বিষয়টি কেবল একটি চুক্তির অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ নয়; বরং এটি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত–সহ বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা মত দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বিধিবিধান ও চুক্তিগত দায়বদ্ধতা বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে। কারণ একদিকে রয়েছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা, অন্যদিকে রয়েছে দেশের জনগণের অর্থনৈতিক স্বার্থ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি বাতিল বা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আইনি ও কূটনৈতিক ঝুঁকি মূল্যায়ন অপরিহার্য।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রতিবেদন চেয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আসন্ন রমজান, সেচ মৌসুম ও গ্রীষ্মকালীন বিদ্যুৎ চাহিদা বিবেচনায় এই নির্দেশনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশ্লেষকেরা।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আদানি চুক্তি এখন কেবল অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল সমন্বয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিয়ে ধাপে ধাপে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজতে চায়।

দেশের বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘদিন ধরেই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন। বর্তমান পর্যালোচনা প্রক্রিয়া সেই সংস্কারের সূচনা কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে এটি স্পষ্ট যে আদানি চুক্তি ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা সরকারের সামনে একটি বড় নীতি–পরীক্ষা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সিদ্ধান্ত যেদিকেই যাক, সেটি দেশের জ্বালানি নীতি ও ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক চুক্তির দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত